আরব দেশগুলোর চাপে কেন পিছু হটলো ভারত


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জুন ১৭, ২০২২, ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ /
আরব দেশগুলোর চাপে কেন পিছু হটলো ভারত

ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির দুজন নেতা ইসলামের নবীকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার পর আরব দেশগুলোর সাথে ভারতের টানাপোড়েন চলছে। এক টিভি বিতর্কে করা মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এর কড়া সমালোচনা এবং প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে সউদী আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় এবং আরব দেশগুলোর কাছ থেকে।

ভারতে ইসলাম-বিদ্বেষ ও মুসলমানদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ২০১৪ সালে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চলছে। কিন্তু আরব বা উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া আগে কখনো দেখা যায়নি। হঠাৎ তাদের এত তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানোর কারণ কী? বিশ্লেষকেরা কয়েকদিন ধরে চলা আরব দেশগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবাদকে নজিরবিহীন বলে মনে করেন। এর একটি কারণ গত দুই দশকে ভারতের সাথে আরব দেশসমূহ, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্পর্কের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আর দ্বিতীয় কারণ আরব দেশগুলো সাধারণত ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করে না।

ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর, বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর হামলার অনেক ঘটনা ঘটেছে। গরু রক্ষার নামে বেশ কয়েকজন মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু সেসব ঘটনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর তরফ থেকে ভারতের নিন্দা বা সমালোচনা করে প্রকাশ্যে কোন বক্তব্য বা উদ্বেগ জানানো হয়নি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এবারে ব্যতিক্রম হওয়ার জন্য ধর্মীয় কারণটিই প্রধান বিবেচ্য হলেও এর পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে সামাজিক মাধ্যম, যেখানে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাকও দেয়া হচ্ছে।

সউদী আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই এবং ওমানে দায়িত্ব পালন করা ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত তালমিজ আহমদ মনে করেন, বিতর্কিত মন্তব্যটি উপসাগরীয় দেশগুলোর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কারণে আরব নেতৃবৃন্দকে বাধ্য হয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, এসব দেশের পররাষ্ট্রনীতি তাদের জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এবং তাদের মূল নীতি হচ্ছে অন্য দেশের কোন বিষয়ে মন্তব্য না করা।

“মন্তব্যটা করা হয়েছে ইসলামের নবী এবং তার পরিবারকে নিয়ে। আমরা জানি যে মুসলিম বিশ্বে নবী মুহাম্মদের গুরুত্ব এবং মুসলমান সম্প্রদায় তাকে নিয়ে কোন অবমাননাকর মন্তব্য মেনে নেবে না। এ রেড লাইন বা সীমা অতিক্রম করে গেছে,” বলেন তিনি। আহমদ বলেন, “এ নিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া এসেছিল সামাজিক মাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যমই এ অঞ্চলের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চাপ তৈরি করেছিল। নবী মুহাম্মদকে নিয়ে করা মন্তব্যে ক্ষোভ ও জনমত তৈরি হয়েছিল যা শেষ পর্যন্ত দেশগুলোর নেতৃবৃন্দকে বাধ্য করেছিল অবস্থান নিতে। খোলাখুলি বললে, নেতাদের আর কোন উপায়ও ছিল না।”

গত দুই দশকে উপসাগরীয় এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছে, সেটি অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকেই। এই মূহুর্তে ভারতের মোট আমদানির অর্ধেক আসে উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের সদস্য ৬টি দেশ থেকে। ইরান এবং ইরাককে যোগ করলে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেই আসে ভারতের পেট্রলের ৮০ শতাংশ। ভারত বছরে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে তার অর্ধেক আসে কাতার থেকে। এসব দেশের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কও খুব জোরালো।

ইউএই’তে বছরে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি করে ভারত। এছাড়া জিসিসির সদস্য উপসাগরীয় ছয়টি দেশে ৮৫ লাখের বেশি ভারতীয় কাজ করেন। বাকি আরব দেশেও বহু ভারতীয় কাজ করেন। আরব দেশগুলো থেকে প্রবাসী ভারতীয়রা বছরে সাড়ে তিন হাজার কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স দেশে পাঠান। এসব কারণেই ভারতের অর্থনীতি উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল- বলেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান।

আর এসব কারণেই আরব দেশের প্রতিক্রিয়ার জবাবে ভারত কিছুটা পিছু হটে যায়। বিজেপি মিজ শর্মাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে, আর মি. জিন্দালকে দল থেকেই বহিষ্কার করেছে। এক বিবৃতিতে বিজেপি বলেছে তারা যে কোন ধর্মের বা যে কোন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে অপমানের নিন্দা করে। কোন সম্প্রদায় বা ধর্মকে অপমান করা, বা হেয় করা- বিজেপি এমন আদর্শেরও বিরুদ্ধে। বিজেপির ওই দুই নেতা এরই মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমাও চেয়েছেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যেখানে জ্বালানি সংকটের আশংকা করছে বহু দেশ, সেখানে নিশ্চিত জ্বালানির উৎস নিয়ে ভারত ঝুঁকি নিতে চাইবে না, সেটাই স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে কর্মসূত্রে বিভিন্ন আরব দেশে বসবাস করা ভারতীয়রা বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়বেন এমন ভয়ও রয়েছে। কুয়েত এবং কাতারের মতো অন্যান্য আরব দেশেও ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক ছড়িয়ে পড়লে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে কারণে ভারতের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়াকে এই মূহুর্তে টানাপোড়েন সামাল দেয়ার একমাত্র উপায় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর বোঝা যাবে আরব দেশের এই প্রতিক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি কোন প্রভাব ভারতের ওপর পড়বে কি-না। কিন্তু আরব দেশসমূহ এবং ভারত – পরস্পরের ওপর তাদের যে নির্ভরশীলতা তাতে এ ঘটনা বেশিদূর এগিয়ে নিতে হয়ত কোন পক্ষই চাইবে না।

সূত্র: ‍বিবিসি।

%d bloggers like this: