চীন-রাশিয়ার দৃষ্টি ন্যাটোর ‘দুর্বল জায়গার প্রতি’ বিশ্লেষণ এএফপির


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জুন ২৫, ২০২২, ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ /
চীন-রাশিয়ার দৃষ্টি ন্যাটোর ‘দুর্বল জায়গার প্রতি’ বিশ্লেষণ এএফপির

মেরু বাতাসে পতপত করে উড়ছে রাশিয়ার পতাকা। আর তুষারে ঢাকা লেনিনের আবক্ষ বেরিয়ে আসছে। তাতে স্লোগানে লেখা ‘কমিউনিজম (সাম্যবাদ) আমাদের লক্ষ্য!’ আর্কটিকের বর্জ্যে হারিয়ে যাওয়া এটা সোভিয়েত কোনো এলাকার কথা বলা হচ্ছে না। এটা বরং নরওয়ের এক কোণে অবস্থিত একটি দ্বীপের কথা বলা হচ্ছে, যেখানে মস্কো চাইলে ইচ্ছেমতো খনি অনুসন্ধান, খনন ও মৎস্য শিকার করতে পারে।

বলা হচ্ছে স্পিটসবার্গেনের কথা। সোয়ালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে বৃহত্তম এ দ্বীপ এখন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সবচেয়ে দুর্বলতার জায়গা।নরওয়ে ও উত্তর মেরুর মাঝামাঝি হিমবাহ ও সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গবেষ্টিত দর্শনীয় এই দ্বীপ এখন মস্কোর পাশাপাশি বেইজিংয়ের জন্যও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, নরওয়ে সার্বভৌমত্ব পেলেও এ দ্বীপ তাদের অধীন নয়। ৪৬টি দেশের নাগরিকেরা এই দ্বীপের সম্পদ অনুসন্ধান ও তা সংগ্রহ করতে পারেন। সবার এখানে সমান অধিকার রয়েছে।

এ কারণেই দ্বীপটির বারেন্টসবার্গ এলাকায় ৩৭০ জনের বেশি রুশ নাগরিক ও ইউক্রেনের দনবাস এলাকার খনিশ্রমিকেরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে সোভিয়েত আমল থেকেই কয়লা উত্তোলনের কাজ করা হচ্ছে। তবে বছরের তিন মাস এখানে অন্ধকার থাকে।

মস্কোর কনসাল সের্গেই গুশচিন বলেছেন, ‘স্পিটসবার্গেন বহু শতাব্দী ধরে রাশিয়ার ঘাম ও রক্তে ঢেকে আছে। এটা নরওয়ের অঞ্চল কি না, তা নিয়ে তর্ক না করে বলছি, এটি রুশ ইতিহাসের অংশ।’ তবে রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলার পর এখান থেকে বেশ কিছু ইউক্রেনীয় চলে গেছে।

মস্কো দীর্ঘকাল ধরে ওই দ্বীপপুঞ্জ ঘিরে বড় পরিকল্পনা করেছে। ১৯২০ সালে এর আনুষ্ঠানিক নাম সোয়ালবার্ড রাখা হলেও একে স্পিটসবার্গেন নামেই ডাকার পক্ষে জোর দিয়ে চলেছে তারা।

রাশিয়ার শক্তিশালী নর্দান ফ্লিট থেকে পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোকে উত্তর আটলান্টিকে প্রবেশের জন্য সোয়ালবার্ডের দক্ষিণতম বিয়ার দ্বীপের কাছাকাছি যেতে হয়। নরওয়ের ফ্রিডৎজফ নানসেন ইনস্টিটিউটের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরিল্ড মো বলেছেন, রাশিয়ার মূল স্বার্থ হলো অন্যদের আক্রমণাত্মক পরিস্থিতি এড়ানো। এ ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলায় তারা যৌক্তিক উপস্থিতি বজায় রাখছে এবং পরিস্থিতির প্রতি মনোযোগ রাখছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দ্বীপটির যৌথ কর্তৃত্ব পেতে ব্যর্থ হয়ে রাশিয়া এখন দ্বিপক্ষীয় পরামর্শের জন্য চাপ দিচ্ছে, যাতে তারা সেখানে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের খনিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

এখন তারা পর্যটন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মনোযোগ বাড়িয়েছে। কিন্তু স্পিটসবার্গেনের খনিসমৃদ্ধ শহর লংইয়ারবাইনে যাওয়ার সড়ক না থাকায় পর্যটকদের বারেন্টসবার্গে আসতে হয় নৌকা বা স্নোমোবাইলে (তুষারের মধ্যে চলা বিশেষ যান) করে।

রুশ ইতিহাসবিদ ও পর্যটক নাটালিয়া মাকসিমিশিনা বলেন, বারেন্টসবার্গ সোভিয়েত ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। পর্যটকেরাও এখানে ছবি তুলতে পছন্দ করেন। তবে মস্কো নরওয়েকে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাধা দেওয়ার জন্য পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবহার করার অভিযোগ করেছে। সেখানে রুশ হেলিকপ্টার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

জার্মানির জর্জ সি. মার্শাল ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের অধ্যাপক জেমস উয়েদার বলেন, সোয়ালবার্ড আর্কটিকের ন্যাটোর ‘অ্যাকিলিস হিল’ বা দুর্বল দিক। কারণ, নরওয়ের মূল ভূখণ্ড থেকে এর দূরত্ব এবং অদ্ভুত আইনি অবস্থা একে রুশ হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিতে পারে।

যুক্তরাজ্যের সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ২০১৮ সালে বলেছিলেন, সরাসরি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা কম। তবে সোয়ালবার্ড রুশ জুয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পশ্চিমকে বিভক্ত করা ও ন্যাটোকে নিষ্ক্রিয় করতে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যগুলোতে অগ্রসর হওয়ার কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে এটি। নরওয়ের পক্ষ থেকে অবশ্য রাশিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়েছে।

এদিকে এই দ্বীপ ঘিরে চীনের আগ্রহ দেখা গেছে। রাশিয়ান কনসাল গুশচিন বলেছেন, ‘যদি আমরা স্পিটসবার্গেন ছেড়ে যাই, তাহলে আমাদের জায়গায় কে আসতে পারে? উদাহরণ হিসেবে বলা যায় চীনের কথা অথবা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা স্পিটেনবার্গেন চুক্তিতে থাকা অন্য কোনো দেশ। গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের মতো সোয়ালবার্ডের দিকেও দৃষ্টি রয়েছে চীনের। সেখানে “পোলার সিল্ক রোড” প্রতিষ্ঠা করতে চায় দেশটি।’

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এ এলাকা তিন গুণ দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে। বরফ গলে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও নৌরুট উন্মোচিত হচ্ছে। নতুন নতুন মাছ ধরার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। তেল, গ্যাসক্ষেত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের আধারে পৌঁছানো সহজ হয়েছে। ফলে সবাই ওই অঞ্চলের দরজায় পা রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর চীন সেই প্রতিযোগিতায় বেশ ভালোভাবে এগিয়ে রয়েছে।

%d bloggers like this: