অনলাইন জুয়া উদ্বেগ বাড়াচ্ছে,আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণ প্রজন্ম


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৪, ২০২২, ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ /
অনলাইন জুয়া উদ্বেগ বাড়াচ্ছে,আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণ প্রজন্ম

শুধু ‘বিগো লাইভ’ সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে ১০৯ কোটি টাকা

  • ক্রেডিট ও ডেভিট কার্ড সহজলভ্য হওয়ায় জুয়ায় আগ্রহ বাড়ছে
  • অপরাধী চক্র দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে
  • গ্রামেও তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এই জুয়া
  • বিটিআরসি অবশেষে বন্ধ করছে ৩৩১টি জুয়ার সাইট

মোবাইলে ফেসবুক চালু করলেই স্কিনে ভেসে উঠছে একাধিক অনলাইন জুয়ার পেজ। ফেসবুক আইডি, পেজ, গ্রুপ, ওয়েবসাইট ও মোবাইলভিত্তিক এনক্রিপ্টেড অ্যাপ দিয়ে চলছে এই জুয়ার সাইটগুলো। এতদিন বিদেশি আয়োজনে এসব জুয়ার সাইট চললেও এখন দেশিয় অনেক প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষও বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা এসব জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। খোয়াচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। অনেকে ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়ছেন। কিছুদিন আগে জুয়ায় সর্বস্ব হারানো এক জন ব্যাংক কর্মকর্তার ব্যাংক থেকে টাকা চুরির ঘটনা বেশ আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। খেটে খওয়া মানুষ দিনের উপার্জনের পুরোটাই দিয়ে দিচ্ছেন এসব অনলাইন জুয়ায়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন- বিটিআরসি ৩৩১টি জুয়ার সাইট বন্ধ করছে। বিটিআরসি বলছে, ক্রেডিট বা ডেভিড কার্ড সহজলভ্য হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকে পড়েছে অনলাইন জুয়ায়। এই সুযোগে অপরাধী চক্র বিদেশে পাচার করছে কোটি কোটি টাকা। সম্প্রতি সিআইডির অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, ‘বিগো লাইভ’ গত ২০ মাসে সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে ১০৯ কোটি টাকা। সবার চোখের সামনে এটা অবাধে চললেও খুব বেশি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

বিশ্বকাপ ঘিরে নতুন শঙ্কা

আগামী রবিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরেও নতুন করে সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে দেশি ও বিদেশি জুয়ার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত ২০১৬ সাল থেকে ক্রিকেটকে ঘিরে বাংলাদেশে অনলাইনে জুয়ার আগ্রহ বাড়তে থাকে। তখন কিছু যুবক খেলার ওয়েবসাইট খুলে মানুষকে যুক্ত করে বেটিংয়ে অংশ নিতে আহ্বান জানায়। পরবর্তীকালে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সাইট থেকে ব্যবহারকারীদের অ্যাপে শিফট করা হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভীর হাসান জোহা বলেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বেটিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সরকারের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ব্যতীত যে কোনো ধরনের ইলেকট্রোনিক লেনদেন কেউ করলে সেটা অর্থ পাচারের মধ্যেও পড়ে।

৩৩১ সাইট বন্ধ করে বিটিআরসি যা বলছে

অনলাইন জুয়ার ৩৩১টি ওয়েবসাইট বন্ধ করে বিটিআরসি বলছে, কয়েকটি অপরাধী চক্র এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে। গুগল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া বা বাজি সংক্রান্ত ১৫০টি গুগল অ্যাপ বন্ধের জন্য রিপোর্ট করেছে বিটিআরসি। ইতিমধ্যে গুগল কর্তৃপক্ষ প্লে-স্টোর থেকে ১৪টি অ্যাপ বন্ধ করেছে এবং অবশিষ্ট অ্যাপ বন্ধ করার জন্য যাচাই-বাছাইসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বিটিআরসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে জুয়া খেলার ওয়েবসাইট ও গুগল অ্যাপের প্রচার এবং অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ায় এ ধরনের ২৭টি ফেসবুক লিংক এবং ৬৯টি ইউটিউব লিংক বন্ধের জন্যও রিপোর্ট করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১৭টি ফেসবুক ও ১৭টি ইউটিউব লিংক বন্ধ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট লিংকগুলোর বন্ধ করার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জুয়া খেলার মাধ্যমে অর্থপাচারের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা জানিয়ে বিটিআরসি বলছে, অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী খেলার চিপস কিনতে প্রয়োজন পড়ে নগদ অর্থ, ক্রেডিট বা ডেভিড কার্ড। এগুলোর মাধ্যমেই অপরাধী চক্র দেশ থেকে টাকা পাচার করে থাকে।

মোবাইল অ্যাপ ছাড়াও অপরাধীরা বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা ডোমেইনের মাধ্যমে সরাসরি অনলাইন গেইম বা জুয়া খেলায় অংশগ্রহণ করে থাকে। এজন্য দেশে এবং বিদেশে হোস্টকৃত বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রথমে অ্যাকাউন্ট খুলে নিবন্ধন করা হয়। তারপর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য কার্ড বা অন্য কোনো মাধ্যমে জমা দিয়ে জুয়ায় অংশ নিতে হয়। অনলাইন জুয়াড়িরা বিকাশ, রকেট, নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা নেয়। প্রকাশ্যে এর হার কমলেও অনলাইনে এ খেলার প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে এবং এতে আসক্ত হচ্ছে তরুণ-তরুণীরা। নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষ এবং তাদের পরিবার।

‘বিগো লাইভ’র পাচার ১০৯ কোটি টাকা

‘বিগো লাইভ’ নামে সিঙ্গাপুরভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে আপত্তিকর কনটেনট ছড়িয়ে ২ কোটি বাংলাদেশি ব্যবহারকারীর কাছে থেকে ২০ মাসে ১০৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। সিআইডির অনুসন্ধান বলছে, হাতিয়ে নেওয়া এই টাকার বেশির ভাগ বিদেশে পাচার করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সিআইডি জানিয়েছে, বিগো লাইভ অ্যাপের মাধ্যমে অসামাজিক কার্যক্রমে জড়িত চীনা ব্যবসায়ীর সঙ্গে আরো কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অসাধু উপায়ে আয় করা টাকা পাচারের পাশাপাশি অন্য কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির পকেটে এই টাকা ঢুকেছে কি না, সেটাও তদন্ত করছে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।

gamble

সিআইডি বলছে, বিগো লাইভ অ্যাপের বিষয়ে তিন-চার মাস ধরে তদন্ত করা হয়। পরে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিআইডি সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের তদন্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা বাদী হয়ে এ বিষয়ে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেছেন। এতে আসামি করা হয়, বিগো বাংলা অ্যাপ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক চীনা নাগরিক ইয়ো জিও, এস এম নাজমুল হক, আরিফ হোসেনসহ দুটি প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো, বিগো বাংলা লিমিটেড ও মনসুন হোল্ডিং লিমিটেড। এছাড়া ১২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

সিআইডি বলছে, ২০ মাসে প্রতিষ্ঠানটি হাতিয়ে নিয়েছে ১০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৯ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময় ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছে আরো ১৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশের দুইটি ব্যাংকে থাকা অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। এই দুটি অ্যাকাউন্টে বর্তমানে ২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা জমা রয়েছে। এসব টাকার বিষয়ে আদালত নির্দেশনা দেবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

%d bloggers like this: