তাহলে তিস্তা চুক্তির ভবিষ্যৎ কী?


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১২, ২০২২, ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ /
তাহলে তিস্তা চুক্তির ভবিষ্যৎ কী?

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বঙ্গেশ্বরী মমতা তিস্তা চুক্তি নিয়ে টালবাহানা করছেন বলে ভারতের বড় বড় কূটনীতিকরা মনে করেন। বঙ্গেশ্বরী আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করছেন। জাতিসংঘের সনদে স্পষ্টভাবে লেখা আছে- কোনো নদী যে দেশ থেকে উৎপত্তি হয় তার ভাটির দেশগুলো সেই পানির একটা বড় অংশ পাবে। এটাকে পরিভাষায় বলে নদীতীরবর্তী দেশগুলোর অধিকার। এ অধিকার ভঙ্গের বিরুদ্ধে মমতার আইনসংগতভাবে বিচার হতে পারে।

কিন্তু বিচার করবে কে? যাদের পরামর্শে বঙ্গেশ্বরী এক যুগ ধরে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে খামখেয়ালিপনা করছেন তারাই তো তাঁকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন। সম্প্রতি দুই দিনের সফরে ঢাকায় গেলে আমাকে সাংবাদিক ও প্রশাসনিক স্তরের বন্ধুরা প্রশ্ন করেছেন তিস্তার পানি দিচ্ছেন না কেন? তিস্তার পানির ভাগ পাওয়া আমাদের ন্যায়সংগত অধিকার।

পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল কার স্বার্থে, কার নির্দেশে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা তিস্তার পানি থেকে বঞ্চিত করছে? ঢাকা থেকে ফিরে এসে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলাম ড. মনমোহন সিং সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেননের সঙ্গে। মেনন সাহেব দীর্ঘকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছেন। একসময় বিদেশ সচিবও ছিলেন। তিস্তা নিয়ে তিনবার কলকাতায় এসে মমতার সঙ্গে কথা বলেছেন। মমতা সে সময় তাঁর কোনো কথার ধার ধারেননি। তিনি শুধু ‘নো’ ‘নো’ বলে গিয়েছিলেন। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতার তৎকালীন মুখ্য সচিব প্রসাদ রায়।

তিনি আবার মেননের ব্যাচমেট ছিলেন। পরে বেরিয়ে এসে মেনন প্রসাদ রায়কে বলেছিলেন, উনি ইংরেজিতে কী বললেন কিছুই তো বুঝলাম না। তোমরা মুখ্যমন্ত্রীকে একটু ইংরেজি শেখাও। মেনন ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের ৪৮ ঘণ্টা আগেও কলকাতায় এসেছিলেন এই ভেবে যে, মমতাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় তিস্তা চুক্তি সই করবেন। কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদদের দৃঢ় ধারণা যে, বিদেশি কোনো শক্তি এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত একাধিক প্রশাসক মনে করেন, সাবেক মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটন এবং কলকাতার মার্কিন দূতাবাসের প্রধান ন্যান্সি পাওয়েল মমতার সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা গোপন বৈঠক করেন।

ওই বৈঠকে তিস্তা প্রসঙ্গ নিয়েও ওই দুই নেত্রীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ আলোচনা হয়। সেই বৈঠকে প্রসঙ্গটি উঠতেই তাঁরা নাকি মমতাকে উপদেশ দেন- খবরদার! বাংলাদেশের সঙ্গে কোনোরকম সহযোগিতা করবেন না। তার পর থেকেই মমতা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যান। এ কথা ভারত ও বাংলাদেশের সবাই জানেন। কমিউনিস্টদের হটিয়ে মমতাকে ক্ষমতায় বসানোর ব্যাপারে তাঁদের একটা বড় ভূমিকা ছিল।

বিএনপি-জামায়াতের নেতারা ঘন ঘন কলকাতায় এসে মমতার সঙ্গে বৈঠক করেন। একটি বৈঠকের দৃশ্য চাপা থাকেনি। প্রয়াত মওদুদ আহমদ যিনি খালেদা মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এবং এরশাদের সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কালীঘাটে বঙ্গেশ্বরীর বাড়িতে বসে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন ক্ষমতায় আসব তখন তিস্তার পানি চুক্তি করব।’ তার পরের ঘটনা জানা থাকলেও লেখা যায় না। মোদি ক্ষমতায় এসে প্রথমবার যখন ঢাকায় গেলেন, মমতা তখন তাঁর সফরসঙ্গী হয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের একশ্রেণির ব্যবসায়ী, এমনকি করোনার সময়ও কলকাতায় এসে বর্তমানে জেলবন্দি মমতার মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে কালীঘাটে মমতার বাড়িতেও গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে তা এখনো গোপন। দিল্লির দাদা ও পশ্চিমবঙ্গের দিদির মধ্যে আঁতাত আর গোপন নেই। মনমোহন সিংহ যখন ঢাকায় গিয়েছিলেন তখন মমতা ছাড়া উত্তর-পূর্ব ভারতের দুজন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। সে সময় ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল তার ফলে ভারত যথেষ্টভাবে উপকৃত হয়েছে।

সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীরা স্বীকার করেছেন ওই চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্য শুধু নয়, নদীর জল ভাগবাটোয়ারা নিয়ে একাধিক চুক্তি কার্যকরের ফলে যাতায়াতেরও অনেক সুবিধা হয়েছে। তাহলে মমতা কেন গোঁয়ার্তুমি করে বসে আছেন। এ রহস্য ভেদ করতে পারেন একমাত্র নরেন্দ্র মোদিই। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুই দফায় বাংলাদেশ সফর করেছেন। অঙ্গরাজ্যের মতামত না নিয়েও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী দিল্লি একতরফাভাবে চুক্তি করতে পারে। কিন্তু তা করা হচ্ছে না কেন! এ প্রশ্নটি এখন বড় আকারে দেখা দিয়েছে।

একসময় মমতা মন্ত্রিসভার সদস্য ফিরহাদ হাকিম মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমরা কি তিস্তা চুক্তি করব শেখ হাসিনাকে জেতানোর জন্য?’ তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করা হয়েছিল- ‘তাহলে কি আপনারা বেগম খালেদাকে জেতাতে চান?’ এর কোনো জবাব তিনি দেননি।

ছাত্রজীবন থেকে আমরা দেখে এসেছি উত্তরবঙ্গের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সবাই কথা বলত। এখনো বলে। সে তিনটি হলো- টি, টিম্বার অ্যান্ড তিস্তা। আজ এ তিনটিই কলঙ্কিত। রহস্যের পর রহস্য। কী সেই রহস্য? আমেরিকা নাকি বিজেপির ভোট? দাদা-দিদির সম্পর্ক যে কত গভীর তা প্রমাণ হয়ে গেল অতি সম্প্রতি গুজরাটে একটি সেতু ভেঙে গিয়ে ১৫০ জন মারা যাওয়ায়।

সবার আগে সংবাদ সম্মেলন করে মমতা বলে দিলেন, এজন্য প্রধানমন্ত্রী দায়ী নন। কে দায়ী তিনি স্পষ্ট করে বলেননি, কিন্তু অন্যদিকে সিপিএমের পশ্চিমবঙ্গ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলে দিয়েছেন, ‘দাদা-দিদির গোপন আঁতাতের কথা আমরা আগেই বলেছিলাম। তা আবার প্রমাণ হয়ে গেল।’ দিদির দয়ায় বিগত লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসন পেয়েছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারাও হতভম্ব।

তাই তিস্তা চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন যাতে না হয় সেজন্য তিনি গড়িমসি করছেন? তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। নদীর উৎস সিকিমে। সিকিম থেকে জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি আমাদের পানি না দিয়ে মারতে চান? সিকিমের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীও মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে তিস্তা চুক্তির পক্ষে সায় দিয়েছিলেন। এখন আবার নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- কার চাপে মমতা তিস্তা চুক্তি করতে দিচ্ছেন না? আর মোদিও কিছু বলছেন না? তিস্তার ভবিষ্যৎ তাহলে কী?

লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক

%d bloggers like this: