‘বঙ্গবন্ধুর খুনির পালক যুক্তরাষ্ট্র’-প্রধানমন্ত্রী


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২৬, ২০২২, ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ /
‘বঙ্গবন্ধুর খুনির পালক যুক্তরাষ্ট্র’-প্রধানমন্ত্রী
  • স্বাচিপের জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আমাদের উদ্বেগ নেই। মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর খুনিদের লালন-পালন করছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে মানবাধিকারের দোহাই অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের লালন-পালন করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের লালন-পালন করছে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের আচরণই এরকম। তারা একদিকে খুনিদের রক্ষা করে অন্যদিকে অন্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ তোলে। অথচ মাদক কারবারিদের হাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিহতের ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থা আর আমাদের বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উদ্বেগ নেই। তারপরও আমাদের প্রচেষ্টা আছে, তাদের (বঙ্গবন্ধুর খুনি) ধরে এনে যেভাবেই হোক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে ইনশাআল্লাহ।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) ৫ম জাতীয় সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, এখনো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ২ জন পাকিস্তানে, একজন কানাডায় ও একজন যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক রয়েছে। আরেকজন কখনো জার্মানি আবার কখনো ভারতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের র‌্যাবের কয়েকজন সদস্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের কোনো উদ্বেগ নেই। যারা ওই আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র, তাদেরও কোনো উদ্বেগ নেই। কারো কোনো উদ্যোগ নেই। কেমন একটা অদ্ভুত বিশ্ব পরিস্থিতি, সেটাই আমার কাছে অবাক লাগে। পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর সমালোচরা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে (বাংলাদেশ) যে রকম একজন ড্রাগ ডিলার, বারবার ড্রাগসহ ধরতে গেছে পুলিশ। তার (পুলিশ) ওপর হামলা করেছে, র‌্যাব ধরতে গেছে হামলা করেছে। ১৪টি মামলার আসামি ড্রাগসহ ধরা পড়ে। পুলিশের ওপর তার গ্রুপ গুলি করে, র‌্যাবের ওপর গুলি করে। তারপর সেও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। তার জন্য আমাদের দেশের কিছু লোক বিভিন্ন জায়গায় তদবির করে বেড়ায়। অথচ এ ড্রাগ ডিলারদের খোঁজ আনতে গিয়ে, ধরতে গিয়ে আমাদেরই একজন এয়ারফোর্সের অফিসারকে ড্রাগ ডিলাররা অপহরণ করে নিয়ে যায়। অত্যন্ত নির্মমভাবে তাকে হত্যা করে। কিছুদিন আগের ঘটনা।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশে কখনো কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটলে আমার কাছে যখন বিচারের দাবি করা হয় তখন আমার মনে হয়Ñ আমার বাবা-মা-ভাইদের হত্যার বিচার পেতে ৩৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবুও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া ও জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। তারা ভোট দিয়েছেন বলেই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে পেরেছি। তিনি আরো বলেন, পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর অবৈধভাবে ক্ষমতার পালাবদলের মাধ্যমে বিচারের পথ বন্ধ করা হয়েছিল। রাজনীতির সুযোগ দেয়া হয় স্বাধীনতাবিরোধীদের। আমরা ক্ষমতায় আসার পর সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছি। বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদেরও ধরে এনে অবশ্যই সাজা নিশ্চিত করা হবে।

তিনি বলেন, ’৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর দখলের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশে আর কোনোদিনই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদল হয়নি। ২০০১ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সিস্টেম ছিল। আমরা সে সময় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছি। এর আগে ১৯৯৬ সালে ভোট চুরির অপরাধে খালেদা জিয়াকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল বাংলাদেশের জনগণ। এরপর যে নির্বাচন হয় সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।

‘দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা চাই’ মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, এখন সব জায়গায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ নিয়ে কথা হয়। জাতির পিতা শূন্য রিজার্ভ নিয়ে শুরু করেছিলেন। ’৯৬ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভ ছিল ২.৫৭ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সেটা ৪৮ বিলিয়নে উন্নীত করেছে। টানা ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। করোনার কারণে আমদানি- রফতানি বন্ধ থাকায় রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। এখন করোনা না থাকার কারণে আমদানি ও রফতানি বেড়েছে। এছাড়া করোনার টিকা কেনা, সেগুলো মানুষকে দিতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা, সিরিঞ্জ কেনা, ফ্রিজার ভাড়া করা। এসবের কারণে রিজার্ভের টাকা খরচ হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব জিনিসের দাম বেড়েছে। সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন খরচও। তাই সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে। বিদ্যুৎ, পানি কোনো কিছুর যেন অপচয় না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

দেশের খাদ্য পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দাম যতই বাড়ুক খাদ্য কিনতে হচ্ছে। ২০০ ডলারের গম ৬০০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। ব্রাজিল থেকে শুরু করে যে দেশে পাচ্ছি ভোজ্যতেল কিনতে হচ্ছে। যে কারণে রিজার্ভ কমে গেছে। আমরা শ্রীলংকাকে সহযোগিতা করেছি। অন্য অনেক দেশ আমাদের কাছে অর্থ সহায়তা চেয়েছিল। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ রাখা লাগে কিসের জন্য? যাতে তিন মাসের খাদ্য আমদানি করতে পারি। আমাদের যে রিজার্ভ আছে তা দিয়ে ৫ মাসের খাদ্য আমদানি করতে পারব। তবে যাতে খাদ্য আমদানি করতে না হয়, এক ইঞ্চি জমিও খালি রাখবেন না, উৎপাদন করুন। তিনি বলেন, দেশের কিছু মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। তারা টাকা তুলে বাসায় রাখছেন। আর চোরের চুরি করার সুযোগ দিচ্ছেন। তাদের টাকা তারা চোরের জন্য সুযোগ করে দিলে আমার বলার কিছু নেই।

শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি বলে, আমরা নাকি কিছুই করিনি। ষড়ঋতুর দেশ তো! যা করি, মানুষ সব ভুলে যায়। তাই মানুষকে জানানো দরকার। ভুলে যাতে না যায়, সে জন্য যা করেছি তা মাঝে মধ্যে তুলে ধরি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে মানুষের ওপর এমনভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করে, মনে হয়েছিল যেন একাত্তরে পাকিস্তানিদের পাশবিকতার পুনরাবৃত্তি। তিনি আরো বলেন, যারা স্বাধীনতাবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে, পাক বাহিনীকে গ্রামের পর গ্রাম নিয়ে গেছে মানুষকে হত্যার জন্য, তাদেরই ক্ষমতায় বসিয়েছে জেনারেল জিয়া। জাতির পিতার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালানো হয়েছে। সংসদে এই হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি অর্ডারের মাধ্যমে বিচাররের হাত থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানে রশিদ আর ডালিম রয়েছে। তারা পৃথিবীর যেখানেই থাক, খুঁজে এনে বিচার করা হবে।

দেশের সব বিভাগে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার চিকিৎসাসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আমরা করে দিয়েছিলাম। এখন প্রতিটি বিভাগে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি। আমাদের দেশে মাতৃ মৃত্যুহার, শিশু মৃত্যুহার বেশি ছিল। মাতৃমৃত্যু কমানোর জন্য বিনা পয়সায় ওষুধ দেয়া হচ্ছে।

কিছু লোক দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থা রাখতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের কিছু ধনী লোক সর্দি-কাশি হলেই বিদেশে চলে যায়। করোনার সময় তারা বিদেশে যেতে না পেরে বাধ্য হয়েই দেশে চিকিৎসা নিয়েছে। করোনার সময় চিকিৎসক-নার্সদের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের অবশ্যই ধৈর্য আছে। আমাদের দেশের ডাক্তাররা অতিরিক্ত কাজ করেন, মানুষকে সেবা দেন। আজকে আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত হলে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়। পরে বেলুন ওড়ানো ও শান্তির প্রতীক কবুতর অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিক্রমে শুরু হয় সম্মেলনের মূল কার্যক্রম।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ সময় আওয়ামী লীগসহ সংগঠনের অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

নতুন কমিটি ঘোষণা : স্বাচিপের পঞ্চম জাতীয় ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ডা. জামালউদ্দিন চৌধুরীকে সভাপতি ও ডা. কামরুল হাসান মিলনকে মহাসচিব করে নতুন এ কমিটি ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। অধ্যাপক ডা. জামালউদ্দিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ডা. কামরুল হাসান মিলন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে কর্মরত। নাম ঘোষণার আগে ওবায়দুল কাদের অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান ও অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজের নেতৃত্বাধীন স্বাচিপের আগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, স্বাচিপের নতুন কমিটিতে যারাই দায়িত্বে এসেছেন, তাদের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছেন।

%d bloggers like this: