খুলনার কয়রা উপজেলার সবুজ বসতি এখন লবনে বিরানভূমি!


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ২, ২০২৩, ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ /
খুলনার কয়রা উপজেলার সবুজ বসতি এখন লবনে বিরানভূমি!

কপোতাক্ষের তীরে যেখানে নতুন বাঁধ দেওয়া হয়েছে, তার নিচেই ছিল কেরামত শেখের ৫ বিঘার ভিটাবাড়ি। ছিল ফসলি জমি। সে জমিটুকু এখনো আছে। তবে লবণাক্ততার কারণে সেখানে ফসল ফলে না। ভিটাবাড়ি চলে গেছে কপোতাক্ষের পেটে। এখন নিঃস্ব অবস্থা তাঁর। একসময়ের গৃহস্থ কেরামত শেখ এখন নদী থেকে মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চালান। তাঁর দুই ছেলে এলাকা ছেড়েছেন বছরখানেক আগে। খুলনা শহরের একটি বস্তিতে থেকে তাঁরা রিকশা চালান। অথচ তিনি রয়ে গেছেন ফসলি জমির টানে। সেখানে আবার যদি ফসল ফলানো যায়, এই আশায়।

একসময়ের গৃহস্থ কৃষক এখন ফেরিওয়ালা

একসময়ের গৃহস্থ কৃষক এখন ফেরিওয়ালা

কয়রার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৬ হাজার পরিবার গ্রাম ছেড়েছে। স্থানান্তরিত হয়েছে ১০ হাজার পরিবার। গোটা উপজেলায় এখনো বাঁধের ওপর বসবাস করছে সাত শতাধিক পরিবার। লবণাক্ততা বসে যাওয়ায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি ফসলহীন রয়েছে। নদীভাঙনে চলে গেছে ৪০০ হেক্টর কৃষিজমি। আবার পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় চিংড়ি ব্যবসায় লোকসান গুনতে হচ্ছে এ এলাকার চাষিদের। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। এ সংখ্যাও কম নয়।

উপজেলার হোগলা গ্রামের ওলিয়ার রহমান কয়েক বছর ধরে তাঁর নিজের ও অন্যের জমি ইজারা নিয়ে চিংড়ি চাষ করতেন। সম্প্রতি চিংড়ি ব্যবসায় লোকসান গুনতে গুনতে এখন ধার-দেনায় ডুবে গেছেন তিনি। নিরুপায় হয়ে দুই ছেলে ও ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বরিশালের একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজে চলে গেছেন এবার। ওলিয়ারের মতো ওই এলাকার অনেক চিংড়িচাষি তাঁদের পেশা পরিবর্তন করেছেন।

কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আমিনুল হক বলেন, প্রতিবছর এখানকার নদ-নদীর পানিতে লবণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৫-৬ পিপিটি পর্যন্ত লবণের মাত্রা এ এলাকার জন্য সহনীয়। অথচ গ্রীষ্মকালে তা ২৫-৩০ পিপিটি পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ জন্য চিংড়ি চাষেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আবার জোয়ারের চাপে বাঁধ ভেঙে কয়েক হাজার চিংড়িঘের ভেসে যায়। এভাবে প্রতিবছর লোকসানের কারণে অনেকেই পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন।

পাঁচটি নদীবেষ্টিত কয়রা উপজেলায় বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে নদীতীরবর্তী দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লোনাপানি ঢুকে পড়ে। সময়মতো বাঁধ মেরামত না হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী লোনাপানি আটকে থাকে জমিতে। এতে সেখানে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ কারণে এই উপজেলায় পাল্টে যাচ্ছে জীবন-জীবিকার চিত্র। কৃষিনির্ভরতা দিন দিন কমে যাওয়ায় বাড়ছে বেকারত্ব।

লবণাক্ততা বসে যাওয়ায় ফসলহীন হয়ে পড়েছে জমি

লবণাক্ততা বসে যাওয়ায় ফসলহীন হয়ে পড়েছে জমি

ঘাটাখালী গ্রামের তৈয়েবুর রহমান বলেন, ‘বছর দশেক আগেও আমাদের জমিগুলো অনেক উর্বর ছিল। সেখানে বছরে একবার ধান চাষ করেও আমরা ভালোভাবে খেয়ে-পরে জীবন যাপন করতাম। কিন্তু এখন তা আর সম্ভব হয়ে উঠছে না। লবণাক্ততার গ্রাস করেছে মাটি। ফলে জমির ওপর ভরসা করে এলাকায় টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে আমাদের মতো গৃহস্থ পরিবারের।’

ওই এলাকার ইউপি সদস্য আবুল কালাম বলেন, আইলার সময় বাঁধ ভেঙে লোনাপানি আটকে ছিল অনেক দিন। সে পানি কমতে না কমতেই আবার আরেকটি দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এভাবে গত ১০ বছরে ওই এলাকায় কমপক্ষে ১০০ বিঘা ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে এলাকা ছেড়েছে ৫১টি পরিবার। তারা কেউ রাঙামাটি, কেউ খুলনা শহরের বস্তিতে, কেউ পার্শ্ববর্তী দেশে স্থায়ীভাবে চলে গেছে।

দশহালিয়া গ্রামে গিয়ে সেখানকার কয়েকজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, একসময় সেখানে পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস ছিল। তাদের প্রত্যেকের ভিটেবাড়িসহ ফসলি জমি ছিল। কপোতাক্ষের আগ্রাসনে গত ২০ বছরে সেখানকার প্রায় ৪৫০ বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। নিঃস্ব হয়ে গ্রাম ছেড়েছে প্রায় ৩০০ পরিবার। এখন যাঁরা টিকে আছেন, তাঁদের দিন কাটছে বেহাল অবস্থায়।

দশহালিয়া গ্রামের মিজান মোল্যা বলেন, ‘একদিকে নদীভাঙন, অন্যদিকে লোনাপানির কারণে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সবার। গাছগাছালি মরে গিয়ে বাড়িঘর ন্যাড়া হয়ে গেছে। মনে হয় যেন মরুভূমিতে বাস করতিছি।’ ওই গ্রামের বাসিন্দা মতি ঢালী বলেন, ‘এলাকায় এখন তেমন কোনো কাজ নেই। আগে যা হোক নিজেগের খ্যাত-খামারে কাজ করতাম, এখন সে উপায়ও নেই। এখন সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মাটি কাটার কাজ করি। তাতে যা পাই, তা দিয়ে মাস চলে কোনোরকমে। শহরে চলি যাব কি না, ভাবছি।’

মহারাজপুরের ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, লোনাপানির কারণে এলাকার খাওয়ার পানির উৎসগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমের পর এলাকায় খাওয়ার পানির সংকট তীব্র হয়। নদীভাঙন আর লোনাপানির আগ্রাসনে দিন দিন বদলে যাচ্ছে এলাকার জীবন-জীবিকা। গত কয়েক বছরে ওই ইউনিয়ন থেকে ৫০০ পরিবার স্থানান্তরিত হয়েছে।

উপজেলার অন্য ছয়টি ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে একই রকম তথ্য পাওয়া গেছে। জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, দুর্যোগে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। তাদের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। কর্মহীন হয়ে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছে তারা।

প্রবহমান নদ-নদীর পানিতে লবণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষি গবেষণা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. হারুনর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছরই এ অঞ্চলের নতুন নতুন এলাকায় লবণপানি প্রবেশ করছে এবং জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। মারা যাচ্ছে গাছগাছালিসহ ফসলাদি। এতে চাষাবাদের জমির পরিমাণ প্রতিবছর কমছে। এর মধ্যে তাঁরা লবণসহিষ্ণু জাতের ধান ও রবি শস্য ফলানোর পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষকদের।

কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, চারদিকে নদীবেষ্টিত এই উপজেলার প্রধান সমস্যা নদীভাঙন। এর সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে সবক্ষেত্রে। সেই সঙ্গে লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় এলাকার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। খাওয়ার পানির সংকট থেকে শুরু করে শিক্ষাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর মানুষের বিপদ সবচেয়ে বেশি। সরকারিভাবে দুর্যোগে অসহায় মানুষকে নানাভাবে সহযোগিতা ও পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

দশহালিয়া গ্রামে গিয়ে এই প্রতিবেদক যখন স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন সেখানে থাকা কানাই মিস্ত্রি নামের একজন একটি মাটির ঘর দেখিয়ে বলেন, অভাবের তাড়নায় তিন পুরুষের ভিটা ফেলে পরিবারটি কোথায় চলে গেছে, তা কেউ বলতে পারে না।

%d bloggers like this: