পদ পদক ও পদবি


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ২, ২০২৩, ১০:০১ পূর্বাহ্ণ /
পদ পদক ও পদবি

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
সম্মোহিত সময়ে দলে পদ দখলের জন্য প্রতিযোগিতা চলে, মোসাহেবি করলে কিংবা কিছু খরচ করলেও দেশে বিদেশে পদক পাওয়া যায় আর পদ না থাকলেও পদবি পাওয়াতেই সন্তষ্ট থাকতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের। না থেকে উপায় কী। নাই মামার চেয়ে কানা মামা যে ভালো। যোগ্যদের সাজঘরে পাঠিয়ে ছলেবলে অযোগ্যরাই পদ দখলে ব্যস্ত সব যে সমাজে সেখানে দায়িত্বশীলতার দুর্ভিক্ষ দেখা যায়।

সুন্দরবনে রূপসা ও শিবশা যেখানে মিশেছে সেই নলেনের মোহনায় যখন তারা পৌঁছাল তখন ঘোর সন্ধ্যা। খুলনা থেকে দুপুরে রওনা দিয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন বায়োলজি স্কুলের ২৫ জন ছাত্রছাত্রী। শ্রাবণের এ সময়টাতে সাধারণত কেউ এভাবে বাদা ভ্রমণে বের হয় না। কিন্তু মানুষ ও প্রকৃতির বিশেষ একটা ব্যবস্থাপনা বোঝার জন্য অসময়ের এই শিক্ষাসফর।

শ্মশ্রুমণ্ডিত অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমেদ বিগত বেশ কয়েক বছর সুন্দরবনের একটি বিশেষ প্রজাতির গাছ ও প্রাণীর মধ্যে মোহনীয় সম্পর্কের স্বরূপ সন্ধানে নেমেছেন। তার ধারণা একটি বিশেষ কো-রিলেশন আছে এ ব্যাপারটার মধ্যে। গাছের জীবন আছে স্যার জগদীশ চন্দ বসু তা বলে গেছেন আর প্রাণীর তো আছেই। এই দুই জীবনের মধ্যে ভাব বা মেলবন্ধন কি হতে পারে না? দু’জনে দু’জনার এ ধারণা যেমন আছে এবং তেমনি ‘আজ দু’জনার দু’টি পথ দু’দিকে গেছে বেঁকে’ জাতীয় ব্যাপার স্যাপারও আছে। আবার ‘রেললাইন চলে সমান্তরাল-দু’জন দু’জনের নেয় না খবর এমনি আড়াল’ এমন একটি অবস্থা কিনা আসহাব উদ্দীন আহমেদ তা ভাবনায় দিনাতিপাত করেন। তার আধ্যাত্মিক গুরু মুরশিদ মাওলার রুহানি সেবায় তিনি এমন ধরনের একটি উপলব্ধির সন্ধান পেয়েছেন। ইদানীং আসহাব উদ্দীন বিজ্ঞানের সাথে সুফিতত্ত্বের সংলাপ, মিল-অমিল, পার্থক্য ও ঐকমত্য বিধানের বিষয়াবলি নিয়েই ভাবেন বেশি।

নলেনের বন অফিস থেকে পাস নিয়ে দু’জন সশস্ত্র গার্ডসহ রাত ৮টার দিকে তাদের লঞ্চ ‘রূপসী খুলনা’ গভীর বাদার পথে পশুর নদীর ভাটির পথে রওনা দিলো। ভোর নাগাদ তাদের কচিখালি পৌঁছার কথা। সেখানে দিনভর একটি বিশেষ গাছের মানবিক আচরণ পরিস্থিতি পরিবীক্ষণ করবে এই গবেষক দল। সমুদ্রতটে আনন্দ বিহারের পরিকল্পনা তো আছেই, তবে যথাসতর্কতার নির্দেশনা দেয়া আছে সবার প্রতি- কেননা গতবার দু’জন মেধাবী তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এই সাগরসৈকতে সাঁতার কাটতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে যায়। অনন্তের পথে তাদের যে যন্ত্রণাময় যাত্রায় যেতে হয়েছিল তা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কাঁদিয়েছিল।

ছেলেমেয়েরা রাতের আহার সেরে লঞ্চের দোতালা পাটাতনে মিলিত হয়েছে সুনিবিড় অন্ধকারে সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য ও নৈঃশব্দ্যের নানা সুর ও সাধনার সাহচর্য লাভের জন্য। গানের আসর বসাতে চেয়েছিল আলো ঝলমল পরিবেশ রচনা করে। আসহাব উদ্দীন সাহেব ‘না’ করে দিয়েছেন। বলেছেন, বনের প্রাণিকুলের সুখনিদ্রার আঘাত ঘটানো সমীচীন হবে না। তিনি মনে করেন, এমনিতে সুন্দরবনের পর্দা পুশিদা ও সৌন্দর্যের স্বাতন্ত্র নানাভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে নানা কিসিমের মানুষের মাতামাতিতে। তেলবাহী ট্যাংকার, সারবাহী বার্জ ডুবছে সুন্দরবনের নদীতে, বনের বাতায়নে বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ পরিকল্পনায় দেশী-বিদেশী বেনিয়ারা। সিডর আইলার আক্রমণ ও তার প্রতিক্রিয়া প্রতিফল তো আছেই। তিনি লঞ্চের শুধু হেডলাইট বাদে অপরাপর সব আলো নিভিয়ে গভীর আত্মিক পরিবেশ রচনার নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি মনে করেন, নিশিথ নিশ্চুপ নিরাপত্তার অনুভব শুধু উপলব্ধির জন্য। দিনের কাজ রাতে আর রাতের কাজ দিনের করা প্রকৃতিসম্মত বা ‘বাস্তবতাবান্ধব’ নয়। সঙ্ঘাত ও সংঘর্ষের কারণ সৃষ্টি হয় বৈপরীত্যের বলয়ে। আসহাব উদ্দীন এটি দেখে খুব ব্যথা পান যে, দেশের আমলারা রাজনীতিবিদদের মতো আর রাজনীতিবিদরা আমলাদের আচরণে নিষ্ঠাবান হয়ে পড়েছেন। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাস্তবায়নে বালসুলভ আচরণের বাড়াবাড়ি চলছে তো চলছে। দেখা যাচ্ছে, যার যা মানায় না- যার যা করার কথা না সে বিজ্ঞের মতো তা করছে। আসহাব উদ্দীন মর্মাহত হন যখন দেশের জনৈক মন্ত্রী মনে করেন দিনের আলো বাঁচানোর জন্য সময় সদ্ব্যবহার্থে সময় গণনা এক ঘণ্টা এগিয়ে আনার যে ব্যবস্থাপনা পৃথিবীর বহু দেশে অক্টোবর নভেম্বরে করা হয়, তিনি বিজ্ঞের মতো বললেন সেদিন, এবার বাংলাদেশে শুরু করা অভ্যাসটি যদি সবাই ভালো মনে করেন তাহলে তার সরকার সদয় হয়ে সারা বছরের জন্য এ ব্যবস্থা জারি করবে।

এটি করে তিনি বা তারা দেশ ও জাতিকে ‘কলঙ্কমুক্ত’ তো করবেনই, গভীর ‘কৃতজ্ঞতায়’ অশেষ সম্মানের ভাগিদার করবেন। চাই কী এ জন্য হয়তো বিশাল পদক পেয়ে যেতে পারেন তাদের প্রধান পুরোহিত। দেশে ও সমাজে আরেক অদ্ভুত আচরণ দেখে আসহাব উদ্দীন যুগপৎ বিস্মিত ও বিব্রত বোধ করেন। তিনি মর্মাহত হন এটি দেখে যে, একজনের ভূমিকা বা সাফল্যকে অন্যের আত্মসাৎ করতে চাওয়ার প্রবণতা আবার তা অর্জনে ব্যর্থ হলে অন্যের সাফল্যকে পুরোটাই ব্যর্থ করে দেয়ার সফলতার সন্ধানে যেন নামেন সবাই।

রাত দুটো হবে সম্ভবত আসহাব উদ্দীন তখন গভীর ঘুমে। স্বপ্ন নয়তো? হয়তো! তার মনে হলো, তিনি বিশাল এক মিলনায়তনে বসে আছেন। খুব শিগগির সেখানে একটি আন্তর্জাতিক টাইপের সম্মেলন শুরু হবে বলে মনে হচ্ছে। বিশাল মঞ্চ চার ধারে গোলাকার বসার জায়গা। উপর-নিচে বিস্তৃত অনেকটা রোমের সেই এম্পিথিয়েটারের মতো, গাজীপুরের জমিদার বাড়ির নাট্যমঞ্চের মতো। হঠাৎ তার খেয়াল হলো তার সিটেই একটি ফোল্ডার জাতীয় প্যাকেট। এর ভেতর অনেকগুলো কাগজপত্র; কিন্তু সেগুলো এমন ভাব ও ভাষায় লেখা তিনি তা পড়তে পারলেন না। তবে ছবি আঁকা আছে কয়েকটি তা দেখে তার মনে হলো পদক জাতীয় কিছু। তার মনে হলো, পদক বিতরণের কোনো অনুষ্ঠান অথবা পদকবিষয়ক কোনো কর্মশালায় তিনি এসেছেন। মিলনায়তনের আকার ও অঙ্গ সৌষ্ঠব দেখে তার মনে হলো নিছক কোনো সেমিনার বা ওয়ার্কশপে আসেননি তিনি, এটি বড় ধরনের কোনো সম্মেলন টম্মেলন হবে। এর মধ্যে শত শত কবুতর পাখা মেলে মিলনায়তনজুড়ে এমনভাবে উড়তে লাগল তাতে তার মনে হলো, তারা শীতল বাতাসের ব্যবস্থা করছে। এমন প্রাকৃতিক তাপানুকূল ব্যবস্থাপনায় তিনি বিশেষ মুগ্ধ হলেন। ব্যাপারটি তার গবেষণার বিষয়ের কাছাকাছি। তার আকিঞ্চন আকাক্সক্ষা যন্ত্র নয়, প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎ থেকে আসুক সরাসরি সেবা। পুরো মিলনায়তনে এমন একটি শীতল অথচ মোলায়েম ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ ফিরে এলো, যেন সবাই বিশেষ সম্মেলনে সানন্দ সাহচর্য লাভ করতে পারে প্রজ্ঞাময় পরিবেশের।

আসহাব উদ্দীন তার চেনাশুনা বা জানা কাউকে দেখছেন না। সেখানে এক এক জায়গায় জটলা করে আছে বিভিন্ন প্রাণী। সাদা রঙের বিড়াল, রঙিন কাকাতুয়া, বাহারি বানর, চিত্রা হরিণ, পাখি, পেঁচা, পানকৌড়ি আরো কত কিছু। একেক গ্রুপের জন্য একেকটি এলাকা বসার জন্য। সবার রঙের বাহারে ও সুশৃঙ্খলভাবে বসার কারণে পুরো মিলনায়তনটি মনে হলো ক্যানভাসে আকা রঙিন চিত্রকল্প। আসহাব উদ্দীন মনে করতে চেষ্টা করলেন বিশাল স্টেডিয়ামে ছেলেমেয়েরা রঙিন ডিসপ্লে কার্ড উল্টিয়ে যেমন চিত্রমালা তৈরি করে তেমন। এখানে কোনো কৃত্রিমতার বালাই নেই- বিভিন্ন রঙের ও প্রজাতির পশুপাখি সুশৃঙ্খলভাবে অবস্থান নিয়ে এই চিত্রময় পরিবেশ রচনা করেছে। আসহাব উদ্দীন দেখলেন সবাই কেমন সুশৃঙ্খল ও পরিবেশের যথাগাম্ভীর্য বজায় রেখে চলেছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে তার কাছে প্রতীয়মান হলো, এটি আসলে একটি আন্তর্জাতিক না হলেও অন্তত জাতীয় পর্যায়ের পদক প্রদান অনুষ্ঠান। তিনটি বিষয়ে বা তিনজনকে পদক দেয়া হবে এ ধরনের একটি আয়োজন চলছে তিনি বুঝতে পারলেন। বড় মুশকিল হলো- তিনি তাদের ভাষা না পড়তে বা না বুঝতে পারছেন না। একপর্যায়ে এক মিনিটের মতো সময়ে আসহাব উদ্দীন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন এবং সে ঘোর কেটে গেলে তিনি যেন সেখানকার কথা বোঝার ক্ষমতা ফিরে ফেলেন। যে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে তা তিনি এখন সুস্পষ্ট বুঝতে পারছেন। তিনি দেখলেন অত্যন্ত সুদর্শন প্রকৃতির একটি নাদুস নুদুস বাঘ এলো মঞ্চে, তার দু’পাশে সুদর্শন সুনয়না হরিণ, তাগড়া ধরনের একটি মহিষ, স্বাস্থ্যবান ও সুশ্রী শিয়াল এবং পেখম তোলা ময়ূর একই সাথে মঞ্চে নিজ নিজ আসনে বসল।

ঘোষণা এলো- সুন্দরবন রাজ্যে বিভিন্ন গোত্র ও গোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ ভূমিকা পালনকারীদের বিশেষ পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান হিসেবে যোগ দিয়েছেন বাবাহকু (বাঘ, বানর, হরিণ ও কুমির) পর্ষদের প্রেসিডিয়াম প্রধান পরম সম্মানীয় সুন্দরমিয়া। তার সাথে আছে পর্ষদের সাহিত্য সংস্কৃতি ও তথ্য বিভাগের প্রধান হরিণা হাপান, শান্তি ও সংঘর্ষ মোকাবেলা বিভাগের প্রধান মশিয়ান মহিষা, পর্ষদের আইনসভার প্রধান শিয়ালেন্দু মামাইয়া ও পদক নির্বাচকমণ্ডলীর সভাপতি ময়ূরানা মাধাভান। বোঝা গেল, জাতীয় পদক প্রদান অনুষ্ঠান হওয়ায় এখানে পর্ষদের প্রেসিডিয়াম প্রধান, আইনসভা ‘বনে জঙ্গলের’ প্রধান পুরোহিত (স্পিকার), পদকের গুরুত্ব, তাৎপর্যবাহী শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের প্রধান এবং পদক নির্বাচকমণ্ডলীর প্রধান উপস্থিত আছে। আসহাব উদ্দীনের কাছে আয়োজনটি অত্যন্ত পরিশীলিত ও তাৎপর্যমণ্ডিত মনে হলো।

ঘোষক অনুষ্ঠানের কাঠামো জানিয়ে দিলো সবাইকে- প্রথমে ‘পদকের পোদ্দারি’ সম্পর্কে মূল কর্মপত্র পেশ করবে কাণ্ডজ্ঞান প্রসারণ ফাউন্ডেশনের প্রধান প্রদায়ক শঙ্খ শাখালিয়া। ঘোষক উল্লেখ করল, শঙ্খ শাখালিয়া ইনস্টিটিউট অব ফরেস্টোলজির সম্মানিত ফেলো এবং পদক অর্জন বর্জন ব্যবহার ও অপব্যবহার বিষয়ক অভিসন্দর্ভের রচয়িতা। সে নিজে কখনো কোনো পদকে ভূষিত হয়নি কিন্তু পদকের নাড়ি নক্ষত্র তার নখদর্পণে। সুন্দর মিয়ার বিশেষ আগ্রহে এবারের পদক প্রদান অনুষ্ঠানে তাকে পদক সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ উপস্থাপনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

শঙ্খ শাখালিয়ার মাথায় লাল রঙের ঝুঁটি। প্রবন্ধ উপস্থাপনের আগে সে মঞ্চে উপবিষ্ট সুন্দর মিয়া ও তার সহকর্মী সতীর্থ অতিথিদেরকে যেভাবে কুর্নিশ জানাল তাতে তার ঝুঁটির ছন্দময় আন্দোলনে আসহাব উদ্দীন বেশ তৃপ্তি পেলেন। বোঝা যায়, শঙ্খ শাখালিয়া বিশেষ বংশীয় গোত্র থেকে উঠে এসেছে। পরে জানতে পারেন আসহাব উদ্দীন, শঙ্খর বাবা সিনিয়র শাখালিয়া সুন্দরবনের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রসৈনিক ছিল, স্বাপ্নিক তাত্ত্বিক হিসেবে ছিল বিশেষভাবে খ্যাত। সে সবাইকে পর্ষদ গঠন পরিচালন বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনার মূল উদ্যোক্তা ছিল ধারণা বিলাত এবং অনেক ব্যাপারে ফর্মুলা দিত। নিজে কোনো দিন কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় আসেনি কিন্তু পরিচালনার পরামর্শক ছিল। আসহাব উদ্দীনের মনে পড়ে, চিকিৎসা বিদ্যায় ডক্টরেট ডিগ্রি আছে এমন পণ্ডিতপ্রবর ডাক্তার আছেন যিনি নিজে এক দিনও রোগী দেখেননি। তার দেশে ঝাঁকড়া চুলের এক পলিটিক্যাল থিওরিটিশিয়ান ছিলেন, নিজে কোনো দিন তার থিওরি প্রয়োগই করতে যাননি। যা হোক সিনিয়র শাখালিয়াকে এখনো পর্ষদের প্রবীণ সদস্যরা বেশ সম্মান ও সমীহসহকারে স্মরণ করে।

শাখালিয়া তার প্রবন্ধে দেখাল পদক প্রদানে যেমন একটি বিশেষ উদ্দেশ্যময়তা কাজ করে পদকপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও উদ্দেশ্যময়তা পরিলক্ষিত হয়। একটু পেছনের ইতিহাস থেকে উদাহরণ টেনে আনল শাখালিয়া, একসময় এই পর্ষদ রাজ্যের এমন কিছু প্রতিষ্ঠান প্রধান ছিল যারা নিজ দফতরের বা অধিক্ষেত্রে কী ঘটছে বা ঘটাচ্ছে সেদিকে নজর না দিয়ে কিভাবে বাইরের বাহবা অর্জন করা যায় সে ব্যাপারে বেশি মনোনিবেশ বিনিয়োগ করত। নিজেকে ‘বিশেষ ধ্যানধারণার প্রবর্তক’ হিসেবে প্রচারের দিকে নজর দিত বেশি। আর বাইরের সংস্থা তার সেই বাহ্যিক ব্যবস্থাপনার ভোল দেখে ভদ্রতার খাতিরে হয়তো সামান্য একটু প্রশংসাই করল- সে এবং তার দফতর সেটিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পর্ষদ মাঝে প্রচারে নামত। সেই পদক বা স্বীকৃতির তকমাকে সে বা তারা একবার পর্ষদের সবার নামে উৎসর্গ কখনো বা পর্ষদ প্রধানকেও উৎসর্গ করত। তাতে স্বল্পজ্ঞানসম্পন্ন পর্ষদরা পুরস্কার বা পদকের বড়ত্ব নিয়ে বড় ধারণা পোষণ করত। শাখালিয়া উদাহরণস্বরূপ এটিও তুলে ধরে, অনেক সময় তল্পিবাহক অধীনস্থদের ব্যবহার করা হয় অন্যের কাছ থেকে ডিগ্রি সংগ্রহে।

একসময় এই বাবাহকুর রাজ্যে যে যত ডিগ্রি জোগাড় করে দিতে পারবে তার পদোন্নতি এমনকি চাকরির বয়স তত বাড়ার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাধ্য হয়ে অনেকে ঘরে বাইরে নানান সংগঠন নিজেরা তৈরি করে তার ব্যানারে পদক দিয়ে প্রচারে প্রসারে তা বাড়িয়ে তুলেছে। প্রাচীনকালে এমনকি নিকট অতীতেও সবসময় ক্ষমতাসীন বা তাদের তল্পিবাহক, স্তাবক ও বিশ্বস্ত অনুসারীদের হাতে রাখার জন্য পদক, সনদ, এনাম, জায়গির ইত্যাদি দিত। আর এসব এনাম পাওয়ার জন্য পদকলোভীরাও নিজেদের ব্যক্তিত্ব, স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদার মাথা খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। পরবর্তীকালে দেখা গেছে, এই পদক প্রদান প্রথা অনেকটা গাধার সামনে মুলা ঝোলানোর মতো পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। নিজের পক্ষের হলে পদক দেয়ার নিয়মকানুন মানার প্রয়োজন পড়ত না। শঙ্খ শাখালিয়া দূরবর্তী এক লোকালয়ের এক সময়কার রীতিনীতি তুলে ধরে বলে, সেখানে পদক দেয়ার জন্য মৌসুমি ও ভুঁইফোড় সংগঠন গড়ে উঠত-তাদের কাজ ছিল যাকে পদক দেয়া হবে তার কাছ থেকেই বিনিময় নিয়ে তাকে পুরস্কৃত করা হতো। আর নিজ সমর্থনে প্রাপ্ত সেই পদকের পোদ্দারিতে মেতে উঠত সেই সমাজের ভুঁইফোড় সব পদবিধারীরা। পদক আর সম্মাননায় তাদের ঘর ভরে উঠত। কেউ কেউ এমনো বলত, ঘরে পদক রাখার জায়গা নেই ‘নগদ’ অর্থ দিলে ভালো হয় ইত্যাদি। সনদ প্রদান ও প্রাপ্তি উপলক্ষে পেশাজীবী, একাডেমিক কিংবা নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাছাকাছি আসার মুখরোচক ঘটনা উল্লেখ করে শঙ্খ শাখালিয়া তার প্রবন্ধের ইতি টানে।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে খেতাব বিতরণের সংস্কৃতি কিভাবে ধারণা ও প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন হতে হতে বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে বিজ্ঞ গবেষক শঙ্খ শাখালিয়ার এমন একটি সুশোভন উপস্থাপনা। আসহাব উদ্দীনের কাছে যথেষ্ট বুদ্ধি ও চিন্তা উদ্দীপক বলে মনে হলো। তার কাছে এটিও মনে হলো- বাবাহকুর এই গবেষক এতসব সত্য তথ্য উপাত্ত পেল কোত্থেকে এবং বাবাহকু পর্ষদ সুন্দরবনে বসবাস করে এ ধরনের উপলব্ধি যদি অর্জন করতে পারে তার পাড়া-প্রতিবেশীরা কেন তা পারে না। আসহাব উদ্দীনের হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় লঞ্চটি নদীর ডুবোচরে ধাক্কা খেলে।

লেখক : রস রচয়িতা, উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

%d bloggers like this: