২০০৭’এর সেই ১/১১ দিনটি আজ


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ১১, ২০২৩, ৭:২২ পূর্বাহ্ণ /
২০০৭’এর সেই ১/১১ দিনটি আজ

আজ ১১ জানুয়ারি। ২০০৭ সালের এই দিনে আবির্ভাব ঘটেছিল কথিত ওয়ান ইলেভেনের। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের একতরফা সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জারি হয় জরুরি অবস্থা। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবরণে গঠিত হয় সেনানিয়ন্ত্রিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’। পরবর্তী সময়ে এটিকে ‘ওয়ান ইলেভেন’ কিংবা ‘১/১১’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ।

কীভাবে কী ঘটেছিল সেদিন? দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। দিনভরই চারদিকে ছিল নানা গুজব, গুঞ্জন। সার্বিক পরিস্থিতি ছিল থমথমে। এই অবস্থায় বিকাল ৪টার দিকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও কাজী জাফর উল্যাহ এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল যোগ দেন কানাডিয়ান হাইকমিশনারের বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে।

কূটনীতিকদের মধ্যে সেই বৈঠকে ছিলেন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিস, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার ডগলাস ফসকেট, জাপানের রাষ্ট্রদূত ইনোওয়ে মাসাইয়েকি, ইউরোপীয় কমিশনের (ইসি) ডেলিগেশনের প্রধান রাষ্ট্রদূত ড. স্টিফান ফ্রোইন ও জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক রেনাটা ডেজালিয়েন। বিকাল পৌনে ৫টায় বৈঠক শেষে বেরিয়ে আসেন আওয়ামী লীগ নেতারা। আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে সাংবাদিকদের কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান তারা। কানাডিয়ান হাইকমিশনারের বাসা থেকে বেরিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা সরাসরি চলে যান দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির সুধাসদনের বাসায়।

আওয়ামী লীগের নেতারা বের হওয়ার আধা ঘণ্টা পর বিকাল সোয়া ৫টার দিকে কানাডিয়ান হাইকমিশনারের বাসায় কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। বৈঠক শেষে তারাও মুখ খোলেননি। তারা সোজা চলে যান গুলশানের হাওয়া ভবনে। সেখানে তারা বৈঠক করেন দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার সঙ্গে। এর আগে দুপুর পৌনে ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সঙ্গে তার বারিধারার বাসায় বৈঠক করেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী।

কূটনীতিকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈঠকের আগে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দুপুর ১২টায় বৈঠক করেন আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সঙ্গে। এতে কমিটির সদস্যরা ছাড়াও সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানেরা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের পরপরই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। অন্যদিকে বিকাল সাড়ে ৪টায় উপদেষ্টা পরিষদের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করা হয়। দুই-এক জন ছাড়া উপদেষ্টাদের প্রায় সবাই বঙ্গভবনে গিয়ে বৈঠক বাতিলের খবরে ফিরে আসেন।

বঙ্গভবনের বৈঠক শেষে তৎকালীন বিমানবাহিনীর প্রধান, নৌবাহিনীর প্রধান, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‍্যাব, বিডিআরসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে সেনাসদরে বৈঠক করেন তখনকার সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ।

রাত সাড়ে ৮টায় বঙ্গভবনে পুনরায় ডাকা হয় উপদেষ্টাদের। উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে উপদেষ্টাদের অবহিত করা হয়। এ সময় উপদেষ্টাদের সবাইকে পদত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়। এরপর প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন। একই সঙ্গে উপদেষ্টারাও পদত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ড. ফখরুদ্দিন আহমদকে। তিনি নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন।

এসব নাটকীয় ঘটনা ও টানটান উত্তেজনা-উদ্বেগের মধ্যেই সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন এবং বিপদের সম্মুখীন হওয়ায় রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।’ প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে জরুরি অবস্থা কার্যকর হবে।’ একই সঙ্গে রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ঢাকাসহ সব মহানগর ও জেলা শহরে কারফিউ বলবৎ থাকার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল।

এরপর নানা উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার মধ্যে রাত সাড়ে ১১টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। এই অবস্থায় সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ সুগম করতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাতে সরকারের তথ্য অধিদপ্তর থেকে মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোকে রাজনৈতিক সংবাদ ও সরকারের সমালোচনামূলক সংবাদ প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য বলা হয়। তাত্ক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল টিভি চ্যানেলের খবর ও টকশো।

%d bloggers like this: