গ্যাসের দাম যে কোনো সময় বাড়তে পারে


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ১৬, ২০২৩, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ /
গ্যাসের দাম যে কোনো সময় বাড়তে পারে

বিদ্যুতের পর এবার বাড়ছে গ্যাসের দাম। যেকোনো মুহূর্তে নতুন এই দামের ঘোষণা দিতে পারে সরকার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে কোনো আবেদন বা শুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে দাম বৃদ্ধির এ ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। দেশের বিদ্যুৎ উপাদন, শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পের গ্যাসের দাম বাড়তে পারে জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। গ্যাসের দাম বাড়ানো সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পেট্রোবাংলা থেকে ঘুরে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর হয়েছে বলে গেছে। যে কোনো দিন ঘোষণা আসতে পারে বিভিন্ন সূত্রে থেকে নিশ্চিত করেছে।

আইএমএফের ঋণ পেতে ভর্তুকি কমানোর চাপ রয়েছে সরকারের ওপর। তাই বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। এরমধ্যেই আইন সংশোধন করে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা সরকার এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছ থেকে নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ইনকিলাবকে বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হবে। এখন সরকারের সিদ্ধান্ত পেলেই নতুন দাম ঘোষণা করা হবে। দাম বাড়াতে আমরা প্রস্তুতির কাজ চলছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ স¤প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ব্যবসায়ীরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস চান। তারা আন্তর্জাতিক বাজার দরে বিল দিতে আগ্রহে দেখিয়েছে। সরকারের তাদের প্রস্তাবের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছে। গ্যাস সরবরাহে শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।

জানা গেছে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম হতে পারে ১৪ টাকা। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম পড়ে ৫ টাকা ২ পয়সা। ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের দাম এখন রয়েছে ১৬ টাকা। এই শ্রেণির গ্রাহকের দাম হতে পারে ২১ টাকা। শিল্পে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহের প্রত্যাশায় উদ্যোক্তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সরকারের তরফ থেকে এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়ে যাওয়ার কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হচ্ছে না বলে জানানো হয়। তখন ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনে বাড়তি দাম দিয়ে গ্যাস নিতেও প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান। সরকারের তরফে এলএনজি আমদানির পর দেশি গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রণের পর প্রতি ঘনমিটারের দাম ৩৫ টাকা করে পড়ছে বলে জানানো হয়। এ দাম ব্যবসায়ীরা দিতে পারবেন কি না জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা ২১ টাকা দিতে সম্মত হন বলে বৈঠকসূত্র জানিয়েছে।

বিইআরসি গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের ৪ জুন গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। তার আগে ২০১৯ সালের জুনে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, তখন বিদ্যুতে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা, ক্যাপটিভে ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা এবং শিল্পে ১০ টাকা ৭০ পয়সা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে সংস্থাটি। এর আগে ২০১৭ সালের ১ মার্চ ও ১ জুন দুই দফায় গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করে সরকার। ওই বছর ১ মার্চ গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিদ্যুতে ঘনমিটার প্রতি ২ টাকা ৯৯ পয়সা, ক্যাপটিভে ৮ টাকা ৯৮ পয়সা ও শিল্পে ৭ টাকা ২৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সে বছরের ১ জুন আরও এক দফা দাম বাড়ে।

তখন ঘনমিটারপ্রতি বিদ্যুতে ৩ টাকা ১৬ পয়সা, ক্যাপটিভে ৯ টাকা ৬২ পয়সা ও শিল্পে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা দাম নির্ধারণ করা হয়। গত২০২২ সালজুড়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে অসহনীয় ভোগান্তি পোহাতে হয় দেশবাসীকে। বাসা-বাড়ি থেকে শিল্প-কারখানা সব খাতেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলা করতে হয়। আসন্ন গরম ও সেচ মৌসুমেও বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের সংকট ভোগাতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। ২০২২ সালে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম এক দফা বাড়ানো হয়। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর হয়েছে। ভর্তুকি কমাতে গ্যাস দাম বাড়ানো হতে পারে।

বিশ্ববাজারে দাম না কমলে গ্যাস আমদানি বাড়াবে না সরকার। ফলে জ্বালানি সংকট ভোগাবে সবাইকে। গ্যাস ঘাটতির প্রভাব ফেলবে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। সরকার বলছে, গ্যাস সংকট থাকলেও একাধিক বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসছে। ফলে বিদ্যুৎ নিয়ে তেমন সংকট হবে না।

অন্যদিকে গত জুনে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের (এলএনজি) দাম বৃদ্ধির ধোয়া তুলে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ দাম বাড়িয়ে দেয় বিইআরসি। সার উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ২৫৯ শতাংশ, শিল্পে ১১.৯৬ শতাংশ, বিদ্যুতে ১২ শতাংশ, ক্যাপটিভে ১৫.৫ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়। আবাসিকে একচুলার দর ৯৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৯০ টাকা, দুই চুলা ৯৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০৮০ টাকা করা হয়। প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের ইউনিট প্রতি দর ১২.৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা, সার উৎপাদনে ঘনমিটার ৪.৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা করা হয়। ওই দাম বাড়ানোর কিছুদিন পরেই স্পর্ট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ করে দেয় সরকার। এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিলে বেড়ে যায় গ্যাস সংকট, এতে শিল্প মালিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তারা উৎপাদন অব্যাহত রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস চান। মন্ত্রালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে তার দাম বাড়িয়ে হলে নিবচ্ছিন্ন গ্যাসের দাবি করেন। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই গ্যাসের দাম বাড়াতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

গত বছরের শুরু থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম চড়া থাকে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তাও নাগালের বাইরে চলে যায়। ভর্তুকির লাগাম টানতে গত জুলাই থেকে সরকার খোলাবাজার থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহকারী কাতার ও ওমানের কোম্পানিও এলএনজি রপ্তানি কমিয়ে দেয়। ফলে পেট্রোবাংলা গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ কমিয়ে দেয়। মার্চেও যেখানে দিনে গড়ে ৭০ কোটি ঘনফুট এলএনজিসহ ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬০ কোটি ঘন ফুটে নেমে আসে। বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস রেশনিং শুরু করে সরকার। কমে যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন। জুলাইয়ের পর থেকে লোডশেডিং বাড়তে থাকে। সরকার ঘোষণা দিয়ে সূচি ধরে লোডশেডিংয়ের ঘোষণা দেয়। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় তাও মানা সম্ভব হয়নি।

গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং দেখে দেশ। নভেম্বর থেকে তাপমাত্রা কমায় বিদ্যুতের চাহিদা হ্রাস পায়। এরপর লোডশেডিং কমে যায়। আগামী মার্চ থেকে গরম পড়বে। সঙ্গে সেচ মৌসুম শুরু হবে। মার্চের শেষ দিকে শুরু হবে রমজান মাস। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাবে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সূত্র বলছে, সে সময় বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর কোনো সুখবর দিতে পারছে না পেট্রোবাংলা। কারণ, দাম না কমলে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনবে না সরকার। তবে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। মার্চ থেকে ভারতের আদানি গ্রæপের বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হবে। সঞ্চালন লাইন নির্মাণ শুরু হওয়ায় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলবে। ফলে বিদ্যুৎ সংকট থাকবে না বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

সংকটের মধ্যেও ২০২২ সালে জ্বালানিতে খরচ বেড়েছে গ্রাহকদের। গত ৫ জুন গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ২৩ শতাংশ। ৫ আগস্ট ডিজেল- পেট্রোলের দাম রেকর্ড পরিমাণ ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায় সরকার। এতে গাড়ি ভাড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। যদিও ২৯ আগস্ট লিটারে মাত্র ৫ টাকা করে কমানো হয়। ২১ নভেম্বর বিদ্যুতের পাইকারি দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়। গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর গণশুনানি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে সিলেটে জ্বালানি সংকটের কারণে আগামী বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিলেট বিভাগীয় কমিটি।

%d bloggers like this: