রফতানি বাণিজ্য চ্যালেঞ্জে পড়বে


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ২০, ২০২৩, ৮:২২ পূর্বাহ্ণ /
রফতানি বাণিজ্য চ্যালেঞ্জে পড়বে
  • শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের দাম তিন গুণ বৃদ্ধিঃ বিশেষজ্ঞদের অভিমত- আইএমএফ থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণে গ্যাসে ভর্তুকি বন্ধে সরকার দাম বাড়িয়েছে : উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, দ্রব্যমূল্য হবে আরো ঊর্ধ্বমুখী, কিছু শিল্পকারখানা বন্ধ হবে এবং বেকারত্বের সংখ্যা বাড়বে……

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ৬ দিনের মাথায় বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম। শিল্প উৎপাদন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সব ধরনের ব্যবসা খাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে প্রায় তিন গুণ। এটা ফেব্রুয়ারি মাস থেকে কার্যকর হবে। গ্যাসের দামের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাবে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বাড়বে।

ফলে প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের বিদেশে রফতানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুধু রফতানিই নয়, এটা দেশে মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে এবং দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে এনে পণ্য উৎপাদন করে তা রফতানি করে থাকে; অথচ ভারত ও পাকিস্তানসহ অনেক দেশ সেসব পণ্যের নিজের কাঁচামালে উৎপাদন করে থাকে। প্রতিযোগিতার বাজারে বায়াররা বাংলাদেশের বেশি দামের পণ্যের বদলে অন্য দেশের কম দামের পণ্য ক্রয়ের দিকে ঝুঁকে পড়বে। চ্যালেঞ্জে পড়বে রফতানি খাত। জানতে চাইলে সিপিডির গবেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিকল্প সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ থাকা সত্তে¡ও সরকার মূলত আইএমএফের সঙ্গে ঋণের যে সমঝোতা করেছেÑ তার অংশ হিসেবেই ভর্তুকি কমাতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্বিগুণের বেশি দাম বাড়িয়েছে। এতে সরকারের কিছুটা সাশ্রয় হবে। কিন্তু এতে করে গ্যাস সরবরাহের উন্নতি হবে না । কারণ এলএনজি আমদানির মতো যথেষ্ট পরিমাণ ডলার সংগ্রহের সুযোগ এখন কম।

শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাসে নিরবচ্ছিন্ন জোগান দেয়ার দাবির মুখে গ্যাসের মূল্য তিন গুণ বাড়ানো হয়েছে। নির্বাহী আদেশে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গত বুধবার এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়। শিল্প ও ব্যবসায়ী সংগঠনগগুলো এ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না জানালেও তারা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের প্রয়োজনে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু এত বেশি দাম বাড়ানো হয়েছে যে, এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। বিদেশে রফতানি করা হয় এমন পণ্য রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। গ্যাসের এই দাম বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি আরো উসকে উঠবে। দ্রব্যমূল্য আরেক দফা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে স্বল্প আয়ের মানুষসহ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন বিষিয়ে উঠবে। আর্থিক টানাটানিতে সঙ্কটাপন্ন হয়ে কোনো মতে খুঁড়িয়ে চলা জীবনযাত্রাকে ঠেলে দেবে চরম অনিশ্চয়তার ভেতর।

জানা গেছে, সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে সাড়ে চারশ’ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে এটি তারই অংশ হিসেবে ভর্তুকি কমাতে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, দাম বাড়ালেও প্রয়োজন মতো গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা কম। কারণ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন এখনো তার কিছুই করা হয়নি। ফলে দাম বেশি দিয়ে গ্যাস কিনলেও উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে। এতে পুরো উৎপাদনে ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রফতানি আয়ে।

গত বছরের শেষ দিকে গ্যাস সঙ্কট নিয়ে দেশের ব্যবসায়ীরা সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছিল। তখন তারা বলেছিল, গ্যাস যদি নিরবচ্ছিন্নভাবে শিল্পে সরবরাহ করা হয়, তাহলে দাম বাড়লেও তারা মেনে নেবে। তাদের পক্ষ থেকে শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট ২২ টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ীদের সেই দাবি থেকেও ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা বেড়েছে গ্যাসের দাম।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সহ-সভাপতি ফজলুল হক বলেন, এত উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনে আমাদের পক্ষে কারখানা চালু রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। এটা অসহনীয়, আমরা মর্মাহত, বিব্রত। এভাবে দাম বাড়ানোর কারণে কারখানা চালানো নিয়েই অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। সব ধরনের শিল্পের উৎপাদনে ক্ষতি হবে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষে এফবিসিসিআই সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ দাম বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল, কিন্তু বাড়ানো হয়েছে প্রায় তিন গুণ। বাজার অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত চাপে গ্যাস সরবরাহ না করতে পারলেও ক্ষুদ্র, মাঝারি, বৃহৎ শিল্প ও বিদ্যুতে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে শিল্পের ওপর আঘাত হেনেছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে, সব পণ্যের দাম বাড়বে। বিদ্যুতের দাম আবারো বাড়বে। সাধারণ মানুষের ঘাড়ে আবার এর বোঝা চাপানো হবে। অনেক ক্ষুদ্র শিল্প বন্ধ হবে। বেকারত্ব বাড়বে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, বৃহৎ শিল্পে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ১১ টাকা ৯৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে। শিল্পে উৎপাদিত নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (ক্যাপটিভ) জন্য ইউনিটপ্রতি গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে। হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ২৬ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে ৩০ টাকা করা হয়েছে। মাঝারি শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১১ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে ৩০ টাকা করা হয়েছে। ভোক্তারা বলছেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির অস্বস্তির ভেতরেই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি অস্বস্তি বাড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে কার্যকর হওয়া গ্যাসের নতুন মূল্য সমন্বিত বিল গ্রাহকরা মার্চ মাসে পরিশোধ করবেন।

আর তখনই উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এনে আরেক দফা বেড়ে যাবে পণ্য-দ্রব্যের মূল্য। একই সঙ্গে এ মূল্যবৃদ্ধি এক মাস বা তারও আগে প্রভাব ফেলবে নিত্যপণ্যের বাজারে। অন্য জিনিসপত্রের দামও বাড়তে পারে। আর এতে মূল্যস্ফীতি আরো উসকে উঠতে পারে। দ্রব্যমূল্যের আরো ঊর্ধ্বমুখী অবস্থা সৃষ্টি হলে স্বল্প আয়ের মানুষসহ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন বিষিয়ে উঠবে। আর্থিক টানাটানিতে সঙ্কটাপন্ন হয়ে কোনো মতে খুঁড়িয়ে চলা জীবনযাত্রাকে ঠেলে দেবে চরম অনিশ্চয়তার ভেতর। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের বিল মার্চ মাসে দিতে হবে। গ্যাসের দাম বাড়ায় পণ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে, তা গিয়ে ঠেকবে ক্রেতার কাঁধে। সব মিলিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা চেপে বসবে।

গ্যাসের দাম বাড়নোর সরকারি ঘোষণায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করায় ভোক্তার আতঙ্কের মাত্রা বহু গুণে বেড়ে গেল। মাত্র ক’দিন আগে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এখন গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সব কিছুতেই পড়বে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষের এতে কষ্ট আরো বাড়বে। অনেক ছোট ছোট শিল্পকারখানা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

এর আগে বছরের শুরুতে তথা ১২ জানুয়ারি সরকারের নির্বাহী আদেশে গড়ে ৫ শতাংশ বাড়ানো হয় গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের দাম। ২০২২ সালের ৫ আগস্ট নির্বাহী আদেশে বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে কাজ করে থাকে। বিইআরসির কাছে দাম বাড়ানোর আবেদন করতে হয়, তারপর সেই আবেদনের ওপর গণশুনানি করা হয়। গণশুনানি শেষে বিইআরসি মূল্যবৃদ্ধির আদেশ দেয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির দাম বৃদ্ধির ক্ষমতা সরকারের হাতে নিতে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্টের আদেশে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর কিছু পরিবর্তন আনা হয়। সেই পরিবর্তনে বিইআরসির পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় নির্বাহী আদেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ক্ষমতা হাতে নেয়। সেই ক্ষমতাবলেই সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করল।

জানতে চাইলে নিট তৈরী পোশাক রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) কার্যনির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাসের দাম বাড়বে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এত অস্বাভাবিক প্রত্যাশা করিনি। যে দাম বেড়েছে তা স্বাভাবিক ও সহনীয় পর্যায় নেই। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে নিটের প্রসেসিং ব্যয় বাড়বে ১৫ শতাংশ। এর প্রভাব পড়বে উৎপাদনের ওপর। এ খরচ বৃদ্ধির ফলে আমাদের সক্ষমতা হারাব। আমরা যদি বায়ারকে বলি গ্যাসের দাম বেড়েছে তাই উৎপাদন খরচ বেড়েছে, প্রতি ডজনে ৫০ সেন্ট বাড়িয়ে দাও; তারা দেবে না। এর পর যদি আমরা কম দামে অর্ডার না নিই তাহলে তারা বিকল্প সোর্সিংয়ে চলে যাবে। এতে আমরা কার্যাদেশ হারাব।

তৈরী পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সহ-সভাপতি এম এ রহিম বলেন, রফতানির ক্ষেত্রে আমরা প্রতিযোগিতার মধ্যে আছি। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি মানে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। আর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাব। আমরা তো লোকসান দিয়ে ব্যবসা করব না, করা সম্ভব হবে না। এক সময় থেমে যাব। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করছি। ফলে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাব।

এদিকে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ৫ দিন পর গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বিএনপি, সিপিবি, গণঅধিকার পরিষদ, জাসদ, বাসদ, গণদল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দল গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়েছে।

%d bloggers like this: