নিয়ত গুণে কাজে বরকত!


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ২২, ২০২৩, ১০:২৪ অপরাহ্ণ /
নিয়ত গুণে কাজে বরকত!

আল্লাহ পাক আমাদের সৃষ্টিকর্তা। মায়া আর ছলনার এ জগতে আমরা ছিলাম না, আমাদের কোনো অস্তিত্বও ছিলো না, তিনিই আমাদের অস্তিত্বে এনেছেন। সৃষ্টি করেছেন, আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে; তাঁর বান্দা হিসেবে। ফের তাঁর আদেশেই আমরা পরকালের যাত্রী হবো। দীর্ঘযাত্রা শেষে তাঁর কাছেই হাজির হবো ফের। এই সৃষ্টি আর ধ্বংস-খেলের পেছনে মহান স্রষ্টার মহান গরজ নিহিত। রব তাঁর পাক কালামে বলেন, মানবজাতি এবং জীনজাতিকে আমি আমার বন্দেগী করার জন্য বানিয়েছি। (সূরা আয-যারিয়াত : ৫৬)।

রবের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর উপাসনা আমাদের উপর ফরজ। হাদিসের ভাষ্য হচ্ছে, ‘দুনিয়া মুমিনের পরীক্ষার স্থান’। পরীক্ষায় ভালো করা আর খারাপ করা দুটোরই অধিকার থাকে পরীক্ষার্থীর। তবে ফলাফল হয় পরীক্ষার্থীর কর্ম মাফিক। ঠিক তেমনি আমাদেরও দুটো রাস্তা ধরে হাঁটার ফুরসত দেয়া হয়েছে, তাই আমরা চাইলেই নেক আমল করতে পারি; যার ফলাফল, চিরসুখের স্থান জান্নাত।

আবার চাইলে নিয়মবহির্ভূতও চলা যায়; যার প্রতিদান হবে অশান্তি আর দুঃখপূর্ণ জাহান্নাম। তবে নেক আমলের পাশাপাশি আমাদের আরেকটি ধাপ অতিক্রম করা জরুর। সেই ধাপটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পাড়ি দিতে পারলেই আমরা আমাদের মহাকাঙ্ক্ষিত সুখের মুলুক, জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাবো। সেই ধাপটি সম্বন্ধে হাবীবে খোদার বাণী হলো, ইবাদাতের মধ্যে এক ধূলিকণা পরিমাণ লোকদেখানো মনোভাব থাকলে আল্লাহ পাক ওই ইবাদাত কবুল করেন না। ( মুসলিম )।

এই লোকদেখানোকেই ইসলামী শরীয়ায় ‘রিয়া’ বলা হয়। রিয়ার ক্ষতি আর ভয়াবহতার কথা আমরা হাদিসে কুদসীতে দেখতে পাই; আল্লাহ পাক বলেন, যে ব্যক্তি কোনো আমল করে এবং তাতে অপরকে আমার আমার সঙ্গে শরীক বানায়ূ আমি তাকে ও তার আমলকে বর্জন করি। ( তিরমিজি)। সুতরাং আমরা ইবাদাত করবো স্রেফ আল্লাহর জন্য। রিয়া তথা লোকদেখানো কিংবা পার্থিব ফায়দা হাসেল করার উদ্দেশ্যে নয়! আর এই ইখলাসপূর্ণ আমল সম্বন্ধে শায়খ আহমদ মুসা জিবরীল বলেন, যারা নিজেদের নেক আমলকে নিজেদের গোনাহের মতই গোপন রাখে, তাদের আমলই ইখলাসপূর্ণ হয়।

মুমিন বুদ্ধিমান। আর একজন জ্ঞানী-বুদ্ধিমান লোক কীভাবে তাঁর ঘামঝরানো ইবাদাতের বিনিময় হিসেবে অল্পকিছু বিনিময় ; মানুষের বলা বাহ্ূবাহ্ পেয়ে তৃপ্তি হাসেল করতে পারে! বান্দার ইবাদাতের বহু দরদাম রয়েছে তার রবের নিকট। আর এই ইবাদাতের অমূল্য দাম দেয়ার জন্য মহান রব তাঁর পাক কালামে ইরশাদ করেন, তাদেরকে খাঁটি দিলে একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর ইবাদাতের হুকুম দেয়া হয়েছে। ( সূরা বাইয়্যিনাহ : ০৪)।

দৃষ্টির প্রখরতা নিয়ে নজর বুলালে আমরা দেখি; জগতের প্রত্যেকটি সেক্টরেই একনিষ্ঠতার আলাদা মূল্য আছে। আছে উচ্চ মান। তাইতো মুহাম্মাদে আরাবি সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার কাজ দিয়ে পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত করে, আল্লাহ তার অন্তরকে মানুষ থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেন, তার এলোমেলো কার্যাবলি তিনি সম্পাদন করে দেন এবং পার্থিব সম্পদ তার কাছে লাঞ্ছিত হয়ে আসে। ( তিরমিজি ও মুসনাদে আহমদ)।

এ ব্যাপারে প্রসিদ্ধ ইতিহাস; সহিহ মুসলিম শরীফের রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে; গুহায় আটকা পড়া তিন ব্যক্তির কথা । বহু সাধনা আর চেষ্টাতদবিরের পর তারা যখন ব্যর্থ হলো, তখন আল্লাহর নিকট আপন কৃত নেক আমলের ওসিলায় মুক্তি চাইলো। প্রত্যেকজন আপন মিনতিতে এটাই বলেছিল : ‘হে আমার রব আমার অমুক আমলটি যদি ‘আপনাকে রাজিখুশি’র লক্ষ্যে করে থাকি; তাহলে আমাদেরকে এখান থেকে মুক্ত করুন ।’ খেয়াল করলে দেখবো যে, তাঁরা রবের ইবাদাতের সঙ্গে একনিষ্ঠতার শর্তারোপ করেছে ।

তথাপি ইবাদাতের মধ্যে একনিষ্ঠতাই মূখ্য। এভাবে দুয়ার মাধ্যমে গুহার মুখ থেকে পাথর সরে গেলে তাদের মুক্ত হওয়া । রবে তরফ থেকে নুসরত আসা ইত্যাদি দ্বারা প্রতিয়মান হয় যেূ যেসকল ইবাদাত আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য হয়, তা দ্বারা বালামুসিবত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। আর এমনসব ইবাদাতের বদলার কথাই আল্লাহ বলেন, কোনো ব্যক্তিই ( এখন) জানে না চোখজুড়ানো কী (জিনিস) তাদের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তাদের কাজের পুরস্কার হিসেবে। (সূরা আস-সাজদাহ : ১৭)।

যারা নিজের আমল লুকিয়ে করে; লুকিয়ে রাখে লোকচক্ষু থেকে। আল্লাহ পাকও তাদের জন্য বিশেষ পুরস্কার লুকিয়ে রেখেছেন। এমনটাই বুঝে আসে উল্লিখিত আয়াতখানা দ্বারা। পুরস্কার নির্ভর করে কর্মের উপর। আমল যেমন; ফলাফল ঠিক তেমন। আপনি-আমি যদি একমাত্র মালিকের জন্য তাঁর মর্জির লক্ষ্যে কোনোকিছু করি তাহলে মহান মালিকও আপনার-আমার জন্য গোপন পুরস্কারের বন্দোবস্ত করবেন।

পক্ষান্তরে আমাদের ইবাদাত যদি রিয়াযুক্ত অর্থাৎ লৌকিকতাপূর্ণ হয়, তাহলে এ ব্যাপারে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. বলেন, ‘ইখলাসবিহীন আমলের নমুনা ওই মুসাফিরের মতো যে একটি ময়লা পানি ভর্তি পাত্র বহন করে, কিন্তু পানিতে ময়লা থাকায় এটা তার কোনো উপকারে আসে না।’ কী চমৎকার উপমা টেনেছেন আমাদের এই সম্মানিত ইমাম। আসলেই তো! রিয়াপূর্ণ আমল আমাদের কোনোপ্রকার কল্যাণেই আসবে না। তা থেকে আমরা ফায়দামন্দ হবো না মোটেও । রিয়া সম্পর্কে আল্লাহ পাকের কথা হলো, যে লোক আপন রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎ কর্ম করে এবং তার রবের সাথে কাউকে শরীক সাব্যস্ত না করে। (সূরা কাহাফ : ১১০)।

আল্লাহ পাক ‘রাহীম’। তিনি আপন বান্দার প্রতি রহমশীল। তাইতো তার পাক কালামের বিভিন্ন আয়াতে খালেস ইবাদাত করা এবং লোকদেখানো থেকে দূরে থাকার জন্য একাধিকবার তাগিদ দিয়েছেন তাঁর গোলামদেরকে। হাদিস শরীফে এই লোকদেখানোকে ছোট শিরক রূপে আখ্যা দেয়া হয়েছে। রাসূলের হাদিসে ঘাটলে দেখতে পারি; তিনি বলেন, আমি তোমাদের ব্যাপারে যে বিষয়ে সর্বাধিক ভয় করছি, তা হলো ছোট শিরক। মজলিসে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম রা. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, ছোট শিরক কী? জবাবে রাসূল সা. বললেন ছোট শিরক হলো, রিয়া তথা লোকদেখানো ইবাদাত। (মুসনাদে আহমদ)।

অন্য এক হাদিস দ্বারা রিয়া’র আরও ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে জানতে পারি । নবীয়ে করিম (সা.) এর ইরশাদ, যে ব্যক্তি দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে কাজ করে, আল্লাহ পাক দরিদ্রতাকে তার সামনে এনে দেন। তার যাবতীয় কাজকর্ম অগোছালো হয়ে যায়। অথচ সে পার্থিব সম্পদের শুধু ততটুকুই লাভ করে যতটুকু তার জন্য তাকদিরে নির্ধারিত আছে। (তিরমিজি ও মুসনাদে আহমদ)।

আমরা মুমিন। আমরা সমুঝদার। প্রত্যেকদিক ফরজ সালাতে সতেরো বার, সুন্নাহ সালাতে আরও দশের দশাধিক বার বলি, ‘আমরা কেবল তোমারই ইবাদাত করি।’ (সূরা ফাতিহা : ০৫)। অতএব এর পরেও যদি আমাদের আমল-ইবাদাত রিয়া যুক্ত হয় তাহলে এর পরিণাম কতইনা ভয়ঙ্কর হবে আমাদের জন্য! তবে কেউ যদি রবের মর্জির লক্ষ্যে কোনো আমল শুরু করে অতঃপর তার মধ্যে লোক-দেখানো ভাব জাগ্রত হয় এবং ব্যক্তি তা থেকে সরে আসার চেষ্টা করে, তাহলে তার ওই আমলও শুদ্ধ হবে।

কিন্তু যদি সে তা থেকে সরে না আসে, তাহলে তার ওই আমলও ভেস্তে যাবে। বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা এরকম, একদিন আমি আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! একবার আমি নামাজ পড়ার সময় অকস্মাৎ এক ব্যক্তি এসে আমাকে নামাজ পড়া অবস্থায় দেখে ফেলে। এর দ্বারা আমার মন আনন্দিত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে আবু হুরায়রা! আল্লাহ তোমার ওপর দয়া করুন, তোমার দ্বিগুণ সওয়াব হয়েছে। প্রথমত, তোমার ইবাদতে গোপনীয়তার কারণে; দ্বিতীয়ত, ইবাদত প্রকাশিত হওয়ার কারণে। (তিরমিজি)।

%d bloggers like this: