‘একটি পাখির দুটি ডানার দূরত্ব না বাড়ুক’


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ২৪, ২০২৩, ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ /
‘একটি পাখির দুটি ডানার দূরত্ব না বাড়ুক’

এস এম আশিকুজ্জামান

বিচারক ও আইনজীবীকে বিচারবিভাগ নামক একটি পাখির দুটি ডানা বলে বিবেচনা করা হয়। যে দুটি ডানার সম্মিলিত পদক্ষেপেই দেশের বিচারবিভাগ এগিয়ে যায়। তবে দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় আদালতে বিচারকের সাথে আইনজীবীর কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। যা দেশের বিচারবিভাগ ও বিচারপ্রার্থী জনগণের জন্য অবশ্যই ভালো কিছু নয়।গত জুন থেকে এই জানুয়ারি পর্যন্ত এমন একাধিক ঘটনা আমাদের গভীর ভাবে ভাবিয়ে তুলেছে!

গত ২৫ জুলাই এক জামিন শুনানিতে পিরোজপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিমের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও বিচারিক কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় হাইকোর্টে এসে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পান পিরোজপুর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) খান মো. আলাউদ্দিন।

অন্যদিকে, গত সেপ্টেম্বরে খুলনা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের (বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা জজ) বিচারকের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনায় খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলামসহ তিন আইনজীবী হাইকোর্টের তলবে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আদালত অবমাননার দায় থেকে অব্যহতি পান।

তবে আদালতে তাদের পক্ষে শুনানি করা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতাদের উদ্দেশ্য বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেন, ‘যারা আদালত অবমাননা করে, বিচারকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে আপনারা তাদের পক্ষে আর কখনো দাঁড়াবেন না।আপনারা এদের পক্ষে দাঁড়ালে ভুল বার্তা যায়।’

বিচারকের সাথে আইনজীবীদের বিরোধের সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে। যে ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বিচারক, আইনজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ওই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন।

গত ২ জানুয়ারি “এজলাসে আদালতের বিচারক ও কর্মচারীদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও অশালীন আচরণের জন্য” একপর্যায়ে আদালত অবমাননার ব্যবস্থা গ্রহণের প্রার্থনা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর চিঠি পাঠান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ ফারুক। পরে সে চিঠি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জে বি এম হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান।

এরপর হাইকোর্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. তানভীর ভূঁইয়া, সমিতির সম্পাদক (প্রশাসন) মো. আক্কাস আলী এবং আইনজীবী জুবায়ের ইসলামকে আগামী ১৭ জানুয়ারি তলব করেন এবং কেন তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে না, রুল জারি করে তা জানতে চান। এদিকে বিচারকের সাথে অশালীন আচরণের নিন্দা জানিয়েছে জুডিসিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশন।

সর্বোপরি আইনজীবী ও আদালত কর্মচারীদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে বিচার কাজ বন্ধের ঘটনায় ভোগান্তি সইতে হয়েছে হাজার হাজার বিচারপ্রার্থীকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার প্রেক্ষাপটে আমরা এই প্রত্যাশা করতে পারি যে, আমাদের বিচারবিভাগ নামক একটি পাখির দুটি ডানার যেন দূরত্ব না বাড়ুক। এক্ষেত্রে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দারের দেয়া তাৎপর্যপূর্ণ একটি বক্তব্য সামনে এনে আজকের লেখাটি শেষ করছি।

২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী আপিল বিভাগে দেয়া বিদায়ী বক্তব্যে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার বলেছিলেন, ‘বিচারক ও আইনজীবী একটি পাখির দুটি ডানা। একটি ডানা যদি অচল হয় তাহলে সে পাখির পক্ষে ওড়া অসম্ভব। একইভাবে বিচারক ও আইনজীবীর একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা ছাড়া সুবিচার সম্ভব না। আর সুবিচার, ন্যায় বিচার, আইনের শাসন আমরা যাই বলি না কেন- তা আইনজীবী ও বিচারকের সমন্বয়েই সম্ভব।’

লেখক: সাংবাদিক, আইনজীবী

%d bloggers like this: